Home » Featured » রেফারেন্ডাম আফটার ম্যাথঃস্কটল্যান্ড কী স্বাধীনতার পথেই হাটছে ?

রেফারেন্ডাম আফটার ম্যাথঃস্কটল্যান্ড কী স্বাধীনতার পথেই হাটছে ?

 

সৈয়দ শাহ সেলিম আহমেদ- লন্ডন থেকে

 

সন্দেহ নেই ১৮ তারিখের গণভোটের ফলাফল ব্রিটেন ইউনিয়নভূক্ত থাকার জন্য স্কটিশ জনগণ রায় দিয়েছেন। গণভোটের ফলাফলের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে ইয়েস ক্যাম্পেইনের ও এসএনপি লিডার অ্যালেক্স সালমন্ড ইতিমধ্যে পদত্যাগও করেছেন। ওয়েস্টমিনিস্টার রাজনীতির কেন্দ্রে যে টান টান উত্তেজনা ও প্রধান তিনটি রাজনৈতিক দলের নেতাদের ভবিষ্যৎ কেরিয়ার হুমকীর মুখে পড়েছিলো, বিশেষ করে ডেভিড ক্যামেরনের রাজনৈতিক ভবিষ্যত রীতিমতো শাখের করাতের উপর ভর করে চলছিলো- যদি স্কটল্যান্ড গণভোটের পক্ষে রায় আসতো- সেদিক থেকে বলা যায়, ওয়েস্টমিনিস্টার কেন্দ্রিক ব্রিটিশ গণতন্ত্র ও রাজনীতি অনেকটাই স্বস্তি এনে দিয়েছে এই ফলাফল। কিন্তু গণভোট কেন্দ্রিক স্কটল্যান্ডের ইস্যু ব্রিটেনের রাজনীতিতে ব্যাপক এক পরিবর্তনের সূচনা করে দিয়েছে তাতে কোন সন্দেহ নেই। এই পরিবর্তন এমনি যে, গণভোটের ফলাফলে অ্যালেক্স সালমন্ড পরাজিত হলেও সুদূর প্রসারী রাজনীতির চালে কিন্তু তিনি জয়ীই হয়েছেন। অ্যালেক্স একদিকে যেমন ৪৫% এরও কিছু উপরে জনমত নিয়ে রাজনীতির চালে লেজিটিমিট এক স্বাধীন মতের পক্ষের অংশের প্রতিনিধিত্ব করার জোরালো দাবী আইন সঙ্গত ভাবে পেয়ে গেলেন, একইভাবে বিকল্প অপশন হিসেবে বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলের স্বাধীনতার ইতিহাস পর্যালোচনা করে ওয়েস্টমিনিস্টার কেন্দ্রিক রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রকেরা যদিনা ভোটারদের কাছে দেয়া ওয়াদা অনুযায়ী ডিভ্যুলোশন মতো অধিক ক্ষমতা বা ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরন না করেন তাহলে স্কটিশ রাজনীতিতে নাটকীয় কিছু যে উদ্ভব হবে সেটাই সহজেই অনুমেয়।

 

গণভোটের রায় যখন প্রকাশিত হচ্ছিলো, ওয়েস্টমিনিস্টার রাজনীতির পর্দার আড়ালে অন্য খেলা তখন অন্যভাবে চলছিলো। কনজারভেটিভ ব্যাক বেঞ্চার ও পলিসি মেকাররা তখন ডেভিড ক্যামেরনের প্রতি স্কটিশ পার্লামেন্টের অধিক ক্ষমতার প্রশ্নে ব্যাখ্যা দাবীর সাথে সাথে ওয়েস্টমিনিস্টার রাজনীতিতে তখন স্কটিশদের কোন অধিকার বা ভোট থাকবেনা- এমন দরকষাকষি চালাচ্ছিলেন। তারা চাচ্ছিলেন রেজাল্ট প্রকাশের সাথে সাথেই ক্যামেরন যেন প্রকাশ্যেই এমন রাজনৈতিক ষ্ট্যান্ট নেন।

 

এদিকে লেবার দলের মনোভাব ও ওয়েস্টমিনিস্টারের সর্বশেষ অবস্থান অবহিত হয়ে স্কটিশ রেফারেন্ডামের ওয়েস্টমিনিস্টার রাজনীতির জয়ের নায়ক সাবেক প্রধানমন্ত্রী গর্ডন ব্রাউন স্কটল্যান্ডে নির্বাচন উত্তর সমাবেশে প্রেসের সামনেই স্কটিশ পার্লামেন্টের আর অধিক ক্ষমতা দেয়ার ওয়াদার কার্যক্রম শুরুর টাইম ফ্রেম ঘোষণা করে বসেন এবং স্কটল্যান্ডবাসীকে জানিয়ে দেন, নির্বাচনী ওয়াদা অনুযায়ী ওয়েস্টমিনিস্টার পার্লামেন্ট হলিরূড সরকারের স্কটিশ পার্লামেন্টের আরো অধিক ক্ষমতা দেয়ার কার্যক্রম শুরু হবে এবং এখন থেকে বিভাজন নয়, বরং আমরা গ্রেট ব্রিটেনের ইউনিয়নের মধ্যে থেকে নিজেদের আরো উন্নয়ন ও শক্তিশালী করবো।

 

স্কটল্যান্ডে গর্ডন ব্রাউনের এই বক্তব্যের পর পরই ডাউনিং ষ্ট্রীট থেকে ডেভিড ক্যামেরন সাংবাদিকদের জানিয়ে দেন, স্কটল্যান্ডের পার্লামেন্টের আরো অধিক ক্ষমতা ও আর্থ সেংশন করা হবে ঠিকই, জানুয়ারি থেকে সেই কার্যক্রম শুরুর টাইমফ্রেমও  ঘোষণা করেন। একইসাথে ক্যামেরন বলেন ইংলিশ ওয়েতে  ইংলিশ আইন অনুযায়ী হওয়া উচিৎ – সেভাবে স্কটল্যান্ড, ওয়েলস, নর্দার্ণ আয়ারল্যান্ডেও আরো অধিক ক্ষমতা দেয়ার কথাও  ক্যামেরন বলেন । ক্যামেরনের এই ইংলিশ আইন-ইংলিশ ওয়ে- বক্তব্য কনজারভেটিভ পার্টির সাবেক ফরেন সেক্রেটারি উইলিয়াম হেগও একই দিন সকালেই মন্তব্য করেন।

 

অপরদিকে স্কাই নিউজ টেলিভিশনের সাথে রোববার এক সাক্ষাতকারে অ্যালেক্স সালমন্ড বলেছেন, “ ভবিষ্যতে স্কটল্যান্ড  নিজেই স্বাধীনতা ঘোষণা করতে পারবে কোন ধরনের গণভোট ছাড়াই”।

 

তিনি বলেন, “স্বাধীনতার প্রশ্নে সবচাইতে উত্তম পন্থা হলো গণভোট, কিন্তূ অন্যান্য ব্যবস্থাও রয়েছে-তিনি যোগ করেন”।

 

সালমন্ড বলেন, স্কটিশ পার্লামেন্টকে আরো অধিক ক্ষমতা দেয়া হবে  আশা করছি, যদি না হয়, তবে  হতে পারে নিজেই নিজের স্বাধীনতা ঘোষণা করতে পারে স্কটল্যান্ড। এরকম স্বাধীনতার ঘোষণা বিশ্বের বহু দেশ করেছে। স্কাই নিউজ টেলিভিশনের নিউজ প্রেজেন্টার, সাংবাদিক মরন্যাগানের সাথে সাক্ষাতকারে অ্যালেক্স সালমন্ড এমন কথাই বলেছেন।

 

সালমন্ড স্কাই নিউজ টেলিভিশনকে বলেছেন, আমরা গণভোটকে মেনে নিয়েছি, এটা সারা জীবনের জন্য একটা সুযোগ, তবে  বিকল্প ব্যবস্থায় ব্রিটেন যদি  ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে আসে কিংবা স্কটিশ পার্লামেন্টের জন্য অধিক ক্ষমতা ও ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ না করেন, তাহলে আমাদের অন্যান্য বিকল্প ব্যবস্থার কথা ভাবতে হবে, কেননা সময়, কাল এবং অবস্থা সকল সময়েই পরিবর্তন হয়ে থাকে। তার মানে আগামী বছরগুলোতে স্বাধীনতার ইস্যু আরো সামনে আসছে।

 

অ্যালেক্স আরো বলেন, “৫৫ বছরের বয়স্ক বেশীরভাগ স্কটিশ গণভোটে তাদের মতামত দিয়েছেন স্কটল্যান্ডের স্বাধীনতার পক্ষে, অর্থাৎ ওয়েস্টমিনিস্টারের ওয়ালে স্কলটল্যান্ডের স্বাধীনতা লিখিত হয়ে আছে”।

 

অবশ্য স্কটিশ লেবার পার্টির নেতা জোহান ল্যামন্ট অ্যালেক্স সালমন্ডের এমন বক্তব্যকে ক্যু এর সাথে তুলনা করেছেন।

 

ইউনিভার্সিটি অব গ্লাসগোর পাবলিক ল-এর প্রফেসর  অ্যাডামস টমকিন্স বলেন, ইউনিলিটারেলি স্বাধীনতার ঘোষণা অবৈধ কাজ হবে।

 

বিশ্লেষকরা বলছেন,  নির্বাচনের আগে ব্রিটেনের শীর্ষ তিন নেতা স্বাক্ষর করে খোলা চিঠিতে স্কটল্যান্ডের জনগণকে যে ওয়াদা দিয়েছিলেন, নির্বাচনের পর পরই এখন সেই ওয়াদা মোতাবেক অধিক ক্ষমতা প্রদানের লক্ষ্যে তিন নেতার সেই ডিভ্যুলশান তথা বিকেন্দ্রীকরনের কাজই হবে এখন সবচাইতে বেশী কঠিণ। আবার ব্রিটিশ এমপিরা আগে ভাগেই বলছেন অধিক ক্ষমতা হলিরূড সরকারের স্কটিশ পার্লামেন্টে দেয়া হয়ে গেলে ওয়েস্টমিনিস্টার সরকারের কোন কার্যক্রমে স্কটিশ এমপিদের কোন ভুমিকা থাকবেনা। ঠিক এ প্রশ্নে নতুন করে বিতর্ক ও টানা পোড়েন শুরু হবে। এডিনবারা পার্লামেন্টের অধিক ক্ষমতার ভারসাম্য ও কেন্দ্রে ভুমিকা এবং প্রতিনিধিত্ব রাখতে স্কটিশ এমপিরা চাইবেন ওয়েস্ট মিনিস্টারে তাদের ভুমিকা আগের মতোই রাখার। ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ হয়ে গেলে কেন্দ্রে প্রতিনিধিত্ব শুধু নিধিরাম সর্দারের মতো নতুন সমস্যার সৃস্টি করবে। আবার কনজারভেটিভ ব্যাক ব্যাঞ্চার ও লেবার এমপিদের পাশ কাটিয়ে ক্যামেরন, মিলিব্যান্ড, নিক ক্লেগ কেমন করে ভিতরের সেই বিদ্রোহ প্রশমিত করবেন- তার উপরও নির্ভর করছে অনেক কিছু।

 

রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা বলেছেন, স্কটল্যান্ডের গণভোটের সময় যারা হ্যা এবং না ক্যাম্পেইনে উপস্থিত ছিলেন, তারা বলছেন, মানুষের ভিতরে যে একটি জাগরনী শক্তির উন্মেষ তারা দেখেছেন, উভয় ক্যাম্পেইনের বক্তব্য তারা শুনেছেন, বডি ল্যাঙ্গুয়েজ তারা  পড়েছেন, তাতে তাদের মনে হচ্ছে, সাধারণ কোন ম্যাকানিজমের মাধ্যমে আপাততঃ স্কটল্যান্ডের স্বাধীনতা গনভোটের ৫৫% এর কিছু উপরের সংখ্যাগরিষ্ট মতামত নিয়ে ইউনিয়ন একীভূত থাকলেও এর প্রভাব কিন্তু অনেক দূর পর্যন্ত যাবে। তারা বলছেন, ক্যামেরন, মিলিব্যান্ড, নিক যেভাবে ডিভ্যুলশানের ওয়াদা করেছেন, সেটা কিন্তু শুধু মাত্র স্কটল্যান্ডের জন্যে হলেই সমস্যার সমাধান হবেনা। সেই ডিভ্যুলশান কার্যক্রম একই সাথে ওয়েলস, নর্দার্ণ আয়ারল্যান্ডেও শুরু করতে হবে। নাহলে নতুন নতুন সমস্যা সৃস্টি হবে। আবার ডিভ্যুলশান কার্যক্রমের উপরে কিন্তু আরো অন্যান্য অনেক কিছুই নির্ভর করছে। অর্থাৎ যথাযথভাবে বিকেন্দ্রীকরন করা না হলে আজ হউক কাল হউক নতুন আরো এক সমস্যার সৃস্টি হবে। এরকম বক্তব্য বিবিসি সহ অন্যান্য মাধ্যমে স্কটল্যান্ড ও এডিনবারায় থাকেন প্রকৌশলী ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের, যারা সশরীরে মাঠে ছিলেন।

 

ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি বিশ্লেষকদের মতে গণভোট  নতুন মাত্রার এক রাজনৈতিক সংকট ঘনীভুত করার ইঙ্গিত সুস্পষ্ঠ। ওয়েস্টমিনিস্টারকে এখন সকল পক্ষের সাথে নিয়ে স্কটিশ পার্লামেন্টের অধিক ক্ষমতা বাস্তবায়নের দিকে যেতে হবে  নিরবচ্ছিন্ন ভাবে, একই সাথে ওয়েলস, নর্দার্ণ আয়ারল্যান্ডের জন্যেও। ডিভ্যুলশান ভিন্ন অন্য উপায়ে সমস্যাকে সমাধানের চেস্টা কিংবা ওয়েস্টমিনিস্টার পার্লামেন্টের সাথে দ্বন্ধ সৃস্টি যে কোন উগ্র পন্থাকে উস্কে দিবে।

 

বিদ্যমান রাজনৈতিক সিনারিও কিন্তু ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণের নির্দেশ করছে সুস্পষ্টভাবে। যদি তাই হয়, কেউ কেউ বলছেন ফেডারেল পদ্ধতির সরকারের দিকে কী ওয়েস্টমিনিস্টার সমাধান খুঁজছে ? আধুনিক গণতন্ত্র কেন্দ্র ও স্থানীয় সরকারের মধ্যে যেমন ভারসাম্য স্থাপন করে, একই সাথে কেন্দ্র ও স্বায়ত্বশাসিত সরকারের মধ্যে ভারসাম্য স্থাপনও জরুরী। গণভোট প্রচারের সময় গর্ডন ব্রাউন অবশ্য অ্যালেক্স সালমন্ড ও এসএনপি পার্টিকে মিথ্যেবাদী ও ধোঁকা দেয়ার অভিযোগ করেছিলেন। বিশ্লেষকরা বলছেন, এসএনপির সাথে ওয়েস্টমিনিস্টার  সরকারের গোপণ কী আলোচনা হয়েছিলো- ডিভ্যুলশানের স্বচ্ছতার স্বার্থে এখনি তা প্রকাশ করাটাই যুক্তিসঙ্গত। কেননা এর উপরও আগামীর রাজনীতি নির্ভর করছে । অ্যালেক্স সালমন্ড- এর এখনকার বক্তব্য সেকথারই নির্দেশ করছে- বলে বিশ্লেষকরা বলছেন।

 

 

স্কটল্যান্ড ঘুরে এসে

২২ সেপ্টেম্বর ২০১৪

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

৫ Comments

Add a Comment

Your email address will not be published.