Home » লন্ডন নিউজ » ব্রিটিশ পাসপোর্ট পাওয়ার নতুন পদ্ধতি: কেইস ষ্টাডি হাঙ্গেরি

ব্রিটিশ পাসপোর্ট পাওয়ার নতুন পদ্ধতি: কেইস ষ্টাডি হাঙ্গেরি

pictur সৈয়দ শাহ সেলিম আহমেদ : ব্রিটিশ পাসপোর্ট পাওয়ার জন্য সারা বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে রয়েছে নানা পন্থা। হেন কোন পথ বা অবলম্বন নেই, যা বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে মানুষ চেষ্টা করছেনা- কি করে ব্রিটেনের স্থায়ী হওয়ার লাল পাসপোর্ট লাভ করা যায়। সেজন্য হরমামেশা নানান কেচ্ছা-কাহিনী পত্র-পত্রিকায় প্রতিনিয়ত প্রকাশিত হচ্ছে। এতে ব্রিটিশ সরকারও যে তৎপর নয়, এমনটি বলা যাবে না। ব্রিটিশ সরকার ও তার হোম অফিস প্রতিনিয়ত নানা আধুনিক উন্নত ব্যবস্থা একের পর এক নিচ্ছে, অথচ ব্রিটিশ পাসপোর্ট লিকিং এর সিস্টেম যেন বন্ধ করতেই পারছেনা। আধুনিক প্রযুক্তির সর্বশেষ সংস্করণ ব্রিটিশ সরকার হোম অফিস, বর্ডার এজেন্সি, পাসপোর্ট, ইমিগ্র্যাশন সকল ক্ষেত্রেই নিয়েছে অথচ কিছুদিন পর পরই সেই সিস্টেম ব্রেক করে একের পর এক পাসপোর্ট কেলেঙ্কারির ঘটনাও জন্ম দিচ্ছে নয়া নয়া পদ্ধতির।

সহজে পাসপোর্ট প্রাপ্তি: হাঙ্গেরিয়ান স্টাইল-

তৃতীয় বিশ্ব যেমন ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ, থাইল্যান্ড সহ আফ্রিকা, নাইজেরিয়া, ঘানা প্রভৃতি দেশ হুবহু অবিকল ব্রিটিশ পাসপোর্ট নিয়ে একজন অনায়াসে রিস্ক ফ্যাক্টরের মধ্যে ঝুঁকি নিয়ে ব্রিটেনের বর্ডার এজেন্সির চোখ ফাঁকি দিয়ে ঢুকে থাকেন, যা হর হামেশা নানা সংবাদের শিরোনাম হচ্ছে। সেজন্যে বিশাল অংকের মোটা টাকাও খরচ করতে হয় কালোবাজারে।

কিন্তু আপনি যদি হাঙ্গেরি, সার্বিয়া, ইউক্রেন এর মতো দেশের নাগরিক হিসেবে হাঙ্গেরির নাগরিকত্ব সার্টিফিকেট লাভ করতে পারেন, তাহলে ব্রিটিশ পাসপোর্ট অনায়াসেই পেয়ে যাবেন।

আর হাঙ্গেরির নাগরিকত্ব লাভের জন্য রেজিস্ট্রেশন করা তেমন কোন কঠিন ব্যাপারও নয়। সেজন্য সেখানে রয়েছে নানা সেন্টার এবং ভিসা প্রসেসিং সেন্টারও। হাঙ্গেরিতে গজিয়ে উঠেছে শতাধিক ভিসা প্রসেসিং সেন্টার- যাদের কাজ হলো হাঙ্গেরির নাগরিকত্ব পাইয়ে দিয়ে ব্রিটিশ পাসপোর্টের জন্য আবেদন করা।

হাঙ্গেরির নাগরিকত্ব লাভের জন্য আপনাকে হাঙ্গেরির নাগরিক হওয়ার কিংবা সেখানে জন্ম নেয়ার প্রয়োজন পড়বেনা। কেবল আপনাকে প্রমাণ করতে হবে, যেকোন কাগজ কিংবা ডিক্লারেশনের মাধ্যমে আপনার পূর্ব পুরুষ অথবা কোন এক দাদা দাদী নানা নানীর মতো পূর্ব পুরুষের বসবাস হাঙ্গেরিতে ছিলো- যদিও আপনি এখন আর সেসবের ধার ধারেননা, কেবল মাত্র সামান্য ইমোশন ছাড়া। বাস- এই কাজ টুকু করেই আপনাকে হাঙ্গেরিতে রেজিস্ট্রেশন করে নেয়া সহজ। সেখানকার অফিসার আপনাকে ফর্মালি ইন্টারভিউ নিবেন কেবল মাত্র এক সাক্ষাৎকার ছাড়া আর কিছুই নয়, কেননা তাতে কোন প্রশ্ন কিংবা ল্যাঙ্গুয়েজ অথবা আপনার এনসেস্ট্রি নিয়ে কোন কিছুই জানতে চাইবেননা অফিসার।

আর হাঙ্গেরিতে মাত্র ৫ হাজার ডলারের বৎসরে আপনার আয় দেখিয়ে ব্রিটিশ পাসপোর্টের জন্য আবেদন সাকসেসফুল শতভাগ, যেখানে ব্রিটেনে লিগ্যাল ওয়েতে আবেদন করতে ২৬ হাজার পাউন্ডের উপরে বেতন শো করতে হয়।

হাঙ্গেরি স্টাইল এখন সার্বিয়া, ইউক্রেনেও ঢেউ-

হাঙ্গেরির এই পন্থার খবর সেখানকার দেশ সমূহে ব্যাপক সাড়া পড়ে যায়। লকে দলে দলে হাঙ্গেরিতে এসে রেজিস্ট্রেশন করে ব্রিটিশ পাসপোর্টের জন্য আবেদন করে সহজেই পাসপোর্ট পেয়ে যাচ্ছে- অথচ তারা কেউই হাংগেরির নাগরিক আদৌ নন। সার্বিয়ান, ইউক্রেনের নাগরিকেরা এখন ব্যাপকভাবে এই সুযোগ গ্রহণ করেছেন।

ইইউ নাগরিকদের জন্য ২০১১ সালের আইনঃ

০১) ইউরোপীয় নাগরিকদের জন্যে ২০১১ সালে নতুন আইন পাশ হয়, যাতে ৫৫০,০০০ হাজার নন-ইউরোপিয় এলাকার নাগরিকদের ইউরোপিয় ইউনিয়নের ক্যাটাগরির মাধ্যমে ব্রিটিশ পাসপোর্ট লাভের এই সুযোগ সৃষ্টি হয়।

০২) এই আইনের ফলে সাবেক অস্ট্রো-হ্যাঙ্গেরিয়ান এম্পায়ারের নাগরিকদেরও গরীব দেশ হাঙ্গেরিয়ান সিটিজেন লাভের মাধ্যমে ব্রিটিশ পাসপোর্ট লাভের সুযোগ সৃষ্টি হয়।

০৩) এই আইনের ফলে যাদের কেবলমাত্র সামান্য পরিমাণে হাঙ্গেরিয়ান দেশের সাথে ইমোশন জড়িত- তাদেরও ব্রিটিশ পাসপোর্ট লাভের দরজা খুলে যায়

০৪) এমনকি এই আইন এলাও করে গরীব দেশের নাগরিকেরা ব্রিটিশ পাসপোর্ট নিয়ে ইউরোপিয় ইউনিয়ন ভুক্ত ধনী দেশ সমূহ যেমন জার্মানি, ব্রিটেন কিংবা ইউরোপের যেকোন দেশে যাওয়ার ও সেটেল্ড হওয়ার পথ খুলে যায়।

পাসপোর্ট দেয়ার আসল উদ্দেশ্য ব্যাহত:

ব্রিটিশ পাসপোর্ট দেয়ার আসল উদ্দেশ্য ব্যাহত হয়, কেননা আইনে বলা হয়েছে যাদের কোন না কোন ভাবে সাবেক অস্ট্রো-হাঙ্গেরিয়ান এম্পায়ারের সাথে সম্পর্ক জড়িত, কেবল তারাই হাঙ্গেরির নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করতে পারবেন আর কনসিকোয়েন্টলি তারাই আবার ব্রিটিশ সিটিজেনশীপ ও ব্রিটিশ পাসপোর্ট লাভের সুযোগ পাবেন ইউরোপিয় আইনের ক্যাটাগরিতে।

অথচ এই আইনের সুযোগে পূর্ব ইউরোপের এরিয়ার বাইরের দেশ সমূহ হতে দলে দলে লোক হাঙ্গেরিতে এসে রেজিস্ট্রেশন করে ব্রিটিশ পাসপোর্ট লাভ করেছেন। ব্রিটিশ পাসপোর্ট অথরিটি, হোম অফিসও শত হাজারেরও উপরে পাসপোর্ট ইস্যুর রিপোর্ট খোদ বর্ডার এজেন্সির ইন্সপেক্টরের রিপোর্টের মাধ্যমে ডেইলি মেইল জানিয়েছে।

জানা গেছে, ইউরোপিয় ইউনিয়নের গরীব দেশ হাঙ্গেরি ও তার পাশের দেশ সার্বিয়া এককভাবেই এই সময়ের মধ্যে ১১২,০০০ পাসপোর্ট ইস্যু করেছে।ফলে এরা সকলেই যে ব্রিটিশ পাসপোর্ট পেয়ে গেছেন এটা ধরেই নেয়া যায়। অনেকেই পাসপোর্ট নিয়ে জার্মানি, ব্রিটেন, সুইজারল্যান্ড মুভও কয়রে ফেলেছেন।

উল্লেখ্য ১৯১৮ সাল নাগাদ সার্বিয়ার নর্দার্ন প্রভিন্স ভোজভোদিনা অস্ট্রো-হাঙ্গেরির সাম্রাজ্যভুক্ত ছিলো- স্বাভাবিকভাবেই তারা ২০১১ সালের প্রণীত আইনের সুযোগে সার্বিয়ার নাগরিক হিসেবে হাঙ্গেরির সাথে সম্পর্কযুক্ত দেখিয়ে নাগরিকত্ব লাভের অধিকার পেয়েছেন ধরেই নেয়া যায়।

জন ভাইনঃ

ইউকে বর্ডার এন্ড ইমিগ্র্যাশন এজেন্সির ইন্সপেক্টর জন ভাইন তার রিপোর্টে উল্লেখ করেছেন, ইউরোপিয়ান সিটিজেনশীপ রুট হলো ইউকে আসার ও ইউকের পাসপোর্ট পাওয়ার এক গুরুত্বপূর্ণ এবং এই রুট দিনে দিনে বৃদ্ধি পাচ্ছে, যারা মূলত: ইউরোপিয় ইউনিয়ন এলাকার বাইরের লোক।

জন ভাইন তার রিপোর্টে ১০০ এপ্লিকেশনের উদাহরণ টেনে বলেন, গত এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর সময়ের মধ্যে তিনভাগেরও অধিক পশ্চিম ইউরোপের নাগরিকেরা ব্রিটিশ সিটিজেনশীপ ও পাসপোর্টের জন্য এপ্লিকেশন করেছেন, যাদের অরিজিন ইউরোপিয় ইকোনোমিক এরিয়ার বাইরে।

সোবোটিকা ও হাঙ্গেরির বর্ডারে সেন্টার:

সার্বিয়ার সোবোটিকা শহর ও হাঙ্গেরির বর্ডারে ডজন ডজন ভিসা প্রসেসিং সেন্টার গজিয়ে উঠেছে।গত বছর ১২,০০০ সার্বিয়ান হাঙ্গেরির পাসপোর্ট লাভ করেছেন বলে জানা গেছে।

হোম অফিসের বক্তব্য:

ডেইলি মেইল হোম অফিসের সাথে যোগাযোগ করে প্রকৃত তথ্য জানার চেষ্টা করে। এর জবাবে হোম অফিসের মুখপাত্র জানালেন, তার কাছে প্রকৃত তথ্য নেই ৫৫০,০০০ মধ্যে কতো লোককে ব্রিটিশ পাসপোর্ট দেয়া হয়েছে । এটা মনিটর করা সম্ভব হচ্ছেনা।

জানা যায়, বুলগেরিয়া ও রুমানিয়া হাঙ্গেরির মতো একই আইন বলবৎ করেছে, যার সুযোগে মালডোভা, মেসিডোনিয়া, সার্বিয়া, ইউক্রেন, তার্কি- যাদের ইউরোপিয় ইকোনোমিক এরিয়ার বাইরে বসবাস, তারা সকলেই এখন এই আইনের সুযোগ নিয়ে পাসপোর্ট লাভ করছেন।

১৩ পাউন্ড প্রফিটঃ

ব্রিটিশ পাসপোর্ট ইস্যু করে ব্রিটেন মাত্র ১৩ পাউন্ড করে প্রতিটি পাসপোর্ট ইস্যুর ক্ষেত্রে প্রফিট পাচ্ছে। অথচ ব্রিটিশ সরকার ৭৩ মিলিয়ন পাউন্ড প্রতি বছর ব্যয় হচ্ছে। আর এদিকে ব্রিটেনে এই সামার হলিডের সময় মিলিয়ন ব্রিটিশ জনগণ তাদের পাসপোর্ট সময় মতো নবায়ন বা মেয়াদ শেষের নতুন পাসপোর্ট হাতে পাবেননা বলে রিপোর্ট বেরিয়েছে। মিলিয়ন পাসপোর্ট এপ্লিকেশন ব্যাকলগ হয়ে আছে। ব্রিটিশ জনগণ তাদের নির্ধারিত হলিডে নিয়ে আছেন টেনশনে।ডেইলি মেইল বলছে ব্যাক ডোর দিয়ে পাসপোর্ট অফিস ইউরোপিয় ইউনিয়নের বাইরের দেশের নাগরিকদের ২০১১ সালের আইনের সুবাধে পাসপোর্ট ইস্যুতে ব্যস্ত অথচ ব্রিটিশরা নিজ দেশের পাসপোর্ট সময়মোতো হাতে পাচ্ছেননা- রীতিমতো স্ক্যান্ডালে পরিণত হয়েছে এই পাসপোর্ট এখন।

জানা গেছে হোম অফিস বিশেষ ব্যবস্থায় ব্রিটিশ জনগণের হলিডে টাইমে জরুরী ভিত্তিতে পাসপোর্ট নবায়নের জন্য পোস্ট অফিস সহ ৫০টি দেশের স্থানীয় দূতাবাসকে অনধিক ১২ মাসের জন্য পাসপোর্ট নবায়ন করার অনুমতি প্রদান করেছে। ৫০ দেশের মধ্যে আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া থাকলেও ইন্ডিয়ার দুতাবাস নাম তালিকাভুক্ত হয়নি ।

পাদটিকাঃ ইউরোপ ও ইউরোপের বাইরে নানাভাবে দালাল ও ফটকাদের খপ্পড়ে পড়ে বহু বাংলাদেশী বৈধ হওয়ার নানা কসরত করছেন, তারাও সঠিক পদ্ধতির মাধ্যমে ইউরোপিয় ইকোনোমিক এরিয়ার বাইরে হেতু হাঙ্গেরি, রুমানিয়া, বুলগেরিয়া বা অস্ট্রো-হাঙ্গেরিয়ানদের বা সার্বিয়ার সুযোগ নিয়ে এপ্লিকেশন করার সুযোগের সদ্ব্যবহার অনেক দালালদের চাইতেও বেটার অপশন বলে অনেকেই মনে করছেন।

Salim932@googlemail.com
22nd June 2014, London.

Add a Comment

Your email address will not be published.