Home » বাংলাদেশ নিউজ » কেন হঠাৎ জাসদ বিরোধীতা-একটি নির্মোহ আলোচনা

কেন হঠাৎ জাসদ বিরোধীতা-একটি নির্মোহ আলোচনা

সৈয়দ শাহ সেলিম আহমেদ-লন্ডন থেকে

স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশের ছাত্রলীগের সম্মেলন থেকে যে ভাঙ্গনের সুর বেজে উঠে তারপর থেকে মূলত মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী শক্তিসমূহের ভিতর থেকে গড়ে উঠে জাসদ- যা আওয়ামীলীগের নেতা, জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বের প্রকাশ্য চ্যালেঞ্জ করে জাসদের তরুণ নেতারা, যারা বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে স্বাধীনতা যুদ্ধ যেমন করেছে, বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে তাকে নেতার আসনে বসিয়ে সকল কাজও সম্পন্ন করেছে। সে অনেক দীর্ঘ ইতিহাস। সে সব আজকে এখানে অবতারনার কোন অবকাশ নয়, বরং জাসদের জন্মলগ্ন একটু বলে নেয়া, যাতে মূল সুরই ছিলো আওয়ামীলীগের বিরোধীতা করে নতুন এক রাজনীতি ও আদর্শ প্রতিষ্ঠার। কেন জাসদের জন্ম হলো- সেটা অনেক তর্ক এবং বিতর্ক আছে, আছে অনেক বাস্তব, চাক্ষুস এবং তারুণ্যের আবেগ, উচ্ছ্বাস আর নতুন আকাংক্ষার, স্বপ্ন লালন ও স্বপ্ন ভঙ্গের ইতিহাস। সেটা যেমন আওয়ামীলীগ জানে, জাসদ নিজেরাও জানে।

বর্তমানে জাসদ নামের যে দলটি আছে, সেটা এতো ক্ষয়িষ্ণু যে, মহাজোট এবং সরকারের শরীক থাকা সত্যেও হঠাৎ করে সরকারের প্রভাবশালী এমপি, মন্ত্রীদের কন্ঠে জাসদ বিরোধীতা কেন ? সঙ্গত কারণেই প্রশ্ন আসতেই পারে। কেননা বাংলাদেশের সর্বত্র ছাড়িয়ে সারা বিশ্বে প্রবাসী সকল বাঙালি মহলে এটা এখন হট কেকের মতো- আওয়ামীলীগ নিজেদের ঘরানার মধ্যে এমন আগুন কেন জ্বালিয়ে দিচ্ছে ? নিশ্চয় এর মধ্যে কোন কারণ রয়েছে। বিজ্ঞান বলে, কোন কার্য ছাড়া কিছু ঘটেনা।

জাসদ বিরোধীতা- এটা হঠাত কোন কার্যকারণের ফল নয়। কেননা যারা শেখ হাসিনার সরকারের বিগত দিনের কাজ ও রাজনৈতিক ছক এবং খেলা পর্যবেক্ষন করছেন, তারা জানেন, এটা হঠাৎ করে সামনে আসেনি এমন করে।এর পেছনে দীর্ঘ এক রাজনৈতিক ছক রয়েছে। যেমন-

০১) শেখ হাসিনা রাজনীতির মাঠে অনেকগুলো ফ্রন্ট ওপেন করে রাজনীতির চাল চালেন, কিছু ফ্রন্ট থাকে এই মুহুর্তের, আর কিছু থাকে ভবিষ্যতের লক্ষ্য হাসিলের জন্য অথবা বিকল্প ফ্রন্ট হিসেবে তিনি ওপেন করে থাকেন। বিশেষ করে বিগত ৫ই জানুয়ারির নির্বাচনের সময় শেখ হাসিনার রাজনৈতিক বহু ফ্রন্ট ওপেন করে রাজনীতি খেলার ছক একটু বিশ্লেষণ করলেই এই বক্তব্যের সত্যতা মিলে যাবে। ২০০৮ সালে মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসার আগে নির্বাচনী ইশতেহারে অঙ্গীকার করেছিলো যুদ্ধাপরাধীদের বিচার, বঙ্গবন্ধু হত্যা, জেল হত্যার বিচার। মহাজোট সরকার অনেক বাধা বিপত্তি পেরিয়েও সেই অঙ্গীকার মোতাবেক শত ভুল ভ্রান্তি সত্যেও যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করছে, রায়ও কার্যকর করছে। বঙ্গবন্ধুর হত্যার বিচারের রায়ও কার্যকর করছে। পাশাপাশি মঞ্জুর হত্যার বিচার চলছে আদালতে ধীরলয়ে, আবার তাহের হত্যার রায়ও প্রকাশিত হয়েছে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করতে গিয়ে শেখ হাসিনার সরকার নিজের জীবনের উপর আগামী দিনের জন্য যে ঝুকি এনেছেন- সেটা যেমন জানেন, তেমনি মঞ্জুর হত্যার রায় যখন প্রকাশিত হবে, তখন মহাজোটের ভিতরে টানাপোড়েন শুরু হয়ে যাবে। একই সাথে তাহের হত্যার রায়ে আপাতত আওয়ামীলীগের জন্য জিয়াকে আদালতের কাঠগড়ায় দাড় করানোর পথ পরিস্কার হয়ে আছে। সামনে আছে খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের মামলার রায়।এই সব রায় যখন হবে, কার্যকর করতে গিয়ে শেখ হাসিনার সরকারের জন্য আগামী দিনে অনেক বিপদ ও ঝুঁকির মধ্যে নিয়ে আসবে। শেখ হাসিনা ভালো করেই জানেন। সব কটা ফ্রন্ট ওপেন করে খেলতে গিয়ে রাজনীতির চালে শেখ হাসিনা এখন অনেক পরিপক্ষ। বিপর্যস্ত বিএনপি এখন আওয়ামীলীগের জন্য কোন ভয়ও নয়। বিদেশীদের দ্বারা সরকারের অভ্যন্তরীনভাবে কোন চাপও তেমন নেই, যতোটুকু চাপ-তা শুধু মিডিয়া ও সংবাদ পত্রে। শেখ হাসিনার সব চাইতে রিলাক্স এবং নিরাপদ এক রাজনৈতিক অবস্থানের সময়ে নিজের মহাজোটের ভিতরের কেন অস্থিরতা তুলছেন- সঙ্গত কারণেই আওয়ামীলীগের অনেকের ভিতরে সেই চিন্তায় ঘুম হারাম হয়ে আছে।বাস্তব সত্য হলো, নির্জীব রাজনৈতিক সময়কেই শেখ হাসিনা বেছে নিয়েছেন- উত্তপ্ত করার জন্য। এটাই মোক্ষম সময় তিনি ভাবছেন। কারণ শেখ হাসিনা জানেন, মহাজোট যখন ক্ষমতায় থাকবেনা, তখন আওয়ামীলীগের বিরোধীতা করার জন্য ও নিজেদের প্রাণ বাঁচানোর জন্যে শুধু নয়, বাংলাদেশের রাজনীতির সংস্কৃতিই হয়ে গেছে, আজ এই দলের সাথে তো কাল ঐ দলের সাথে, সেই পথের কাটা বিছানোর জন্য আওয়ামীলীগ সরকার চায় এই সময়ে নয়, আগামীতে রাজনীতির টার্নিং পয়েন্টে অথবা রাজনীতির পট পরিবর্তনের গতিপথকে ভিন্ন দিকে নিয়ে যাওয়ার জন্যে জাসদই হবে হাতিয়ার। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করে যেমন সব দুষ্ট চাড়া উপড়ে ফেলছেন, তেমনি আগাছা-পরগাছাও রাজনীতি থেকে পরিস্কার তিনি ক্ষমতা ছাড়ার আগে এবং নিজের ভবিষ্যৎ শুধু নয়, আওয়ামীলীগের আগামীদিনের রাজনীতিকে নিরাপদ রাখতে জাসদ ও হাসানুল হক ইনু বঙ্গবন্ধুর হত্যার দায়ে হাতিয়ার বানানোই হবে মোক্ষম উপাদান। কেননা আওয়ামীলীগ এই টার্মে যেভাবে রাজনীতি শুরু করেছে, তাকে ষ্ট্যালিনীয়-লেলিনীয় কায়দায় পথ চলা ছাড়া বিকল্প কোন পথ আওয়ামীলীগ নিজেই খোলা রাখেনি।

০২) মিডিয়া প্রচার আর যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন চাপে শেষ পর্যন্ত যদি নরেন্দ্রমোদীর মত পাল্টে যায়, এরা যদি বাংলাদেশে অন্তত অংশগ্রহণমূলক স্বচ্ছ নির্বাচনের লক্ষ্যে জাতি সংঘের নেতৃত্বে ইউএন চ্যাপ্টার এইট বাংলাদেশে বাস্তবায়ন করতে উদ্যত হয়, তখন যাতে তার আগেই মন্দের ভালো এই জাসদই হতে পারে বোঝাপড়ার রাজনীতিতে একমাত্র বিরোধীদল বা জোট। সেই ছক থেকে উপর মহলের বিশেষ সিগন্যালেই সেলিম-হানিফ-মোকাম্মেল বিশেষ মিশনে নেমেছেন। হাসানুল হক ইনুর জাসদ সহ এই ঘরানার দলগুলোকে বিরোধীদলের বা সরকারের বিরোধী শিবিরে পাঠিয়ে আওয়ামীলীগের সরকার নতুন খেলা শুরু করতে চায়।সেজন্যে চাই দক্ষ পরিকল্পণা। এরশাদের জাতীয় পার্টি কিংবা রওশন-বাবলু-ফিরোজ রশীদকে দিয়ে যে বিরোধীতার ধোয়া তুলা যায়নি বা যাবেওনা, সেই কুয়াশাচ্ছন্ন বা বিরোধীতার ধুম্রজাল ইনু-মেনন-দিলীপ বড়ুয়া বা এই ধরনের বাম ঘেষা দলকে দিয়ে সম্ভব, সেই ছক থেকেই আগে ভাগেই বিরোধীতার অম্ল-মিষ্টি-মধুর সূচনা, যাতে আমও খাওয়া যায়, ডাল ভাঙ্গেনা আবার সব কূলও রক্ষা হয়।

০৩) ঝিমিয়ে পড়া ও নিজেদের মধ্যে অন্তর্কলহে লিপ্ত আওয়ামীলীগের বিভিন্ন স্তরের নেতা কর্মীদের মধ্যে চাঙ্গা ভাব ও ভাগ ভাটোয়ারা ও হালুয়া রুটির রাজনীতি থেকে মাঠের রাজনীতিতে ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে এক ধরনের উত্তাপ ছড়ানোর প্রয়াস- যাতে বিভিন্ন জায়গায় ও কলেজে আওয়ামীলীগ-জাসদ এর মধ্যে সংঘর্ষ আপনা আপনিই বেধে যায়।যার ফলে উপরের দিকেও উপরোক্ত রাজনীতির ছক আঁকতে ও বাস্তবায়ন করতে সুবিধা হয়।

০৪)নরেন্দ্র মোদী যখন ঢাকা সফর করেন, তখন শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়ার সঙ্গে পৃথক পৃথক ভাবে একান্তে কথা বলেছিলেন। দুই নেত্রীকে নরেন্দ্র মোদী একটা কমন সিগন্যাল দিয়েছেন- গণতান্ত্রিক শাসন আর জঙ্গি বিরোধী অবস্থান। নরেন্দ্র মোদীর সফট বুদ্ধ ডিপ্লোম্যাসি যদিও ঢাকার রাজনীতিতে তিনি এপ্লাই করেননি, তারপরেও তার সিগন্যালকেন্দ্রিক যে রাজনীতির সমঝোতার পথ খুলে গিয়েছে, শেষ পর্যন্ত যদি সেই সিগন্যালের ধারাবাহিকতায় জেল জুলুম থেকে বাঁচতে খালেদা জিয়া শেখ হাসিনার নির্ধারিত ছকের মধ্যে নির্বাচনে এসে যান শর্ত সাপেক্ষে এবং ভারতীয় লবিকে সন্তুষ্ট রাখতে জঙ্গি বিরোধী অবস্থানে চলে আসেন, তখন রাজনীতিতে নতুন এক অবস্থা তৈরি হয়ে যাবে- যা হাসানুল হক ইনু জাসদের রাজনীতি শেখ হাসিনার কাছে অন্য মাত্রায় প্রতিভাত হবে সময় ও ঘটনার প্রেক্ষিতে। কারণ খালেদা জিয়া সব শর্তের আড়ালে নিজ পুত্র তারেক এবং জিয়ার ইমেজ রক্ষার্থে ইনু জাসদ বধে শেখ হাসিনার সমঝোতার প্ল্যাটফর্মে হাওয়া দিবেন- সন্দেহ নাই। সেই হিসেব নিকেশে শেখ হাসিনার চাই এই ফ্রন্টও ওপেন করে রাখার যাতে রাজনৈতিক চালটাও তখন য্যুৎসই ভাবে দেয়া যায় এবং আওয়ামীলীগের ষ্ট্যালিনীয় বধ রাজনীতি থেকে ফিরে বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক রাজনীতির পথের দিকে চালিত করা যায়- শেখ হাসিনার জন্য চাই সেই রাজনীতির এক্সিট রুটের ব্যবস্থা ।
Salim932@googlemail.com
28th August 2015, London

Add a Comment

Your email address will not be published.