Home » কলাম » নাগরিক সমাজ: ১/১১র কুশীলব, জরুরী আইনের তল্পিবাহক নাকি হ্যামিলনের বংশীওয়ালা

নাগরিক সমাজ: ১/১১র কুশীলব, জরুরী আইনের তল্পিবাহক নাকি হ্যামিলনের বংশীওয়ালা

ব্রিটিশের দ্বারা দুইশত বছরের গোলামীর শাসন আর পাকিস্তানের চব্বিশ বছরের নিপীড়ন, নির্যাতন আর বাঙালির স্বায়ত্তশাসন, স্বাধীনতা আর মুক্তিযুদ্ধকালীন আন্দোলনকে পেছনের চাকার সাথে ইতিহাসের পেছনের কাতারে শৃঙ্খলিত করে রাখার জন্যে সেই আদিকাল থেকে তৈরি হয়েছিলো কায়েমি স্বার্থবাদীদের এবং পরবর্তীতে ব্রিটিশের তৈরি কতিপয় আস্তাভাজন,

তথাকথিত ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিতদের নাগরিক ক্লাবের নামে পরিচিত আর পাকিস্তান আমলে উঁচু মার্গের ঐ উচ্চ মধ্যবিত্তের ঢাকা ক্লাবের সার্কেলে গড়ে উঠা স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে গড়ে উঠা বাংলাদেশ নামক এই রাষ্ট্রটির জন্মের মধ্য দিয়ে বাঙালি নামক নয়া এক জাতি স্বত্বার ও জাতি রাষ্ট্রের যে উন্মেষ ও অভ্যুদয় ঘটলো, বিশ্বকে জানান দিলো বাঙালির স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য ও স্বতন্ত্র আবাসভূমির কথা, নিজেদের উর্ধ্বমুখী চাহিদা ও যোগানের কথা-যার পুরো ভাগে ইংরেজদের প্রতিষ্ঠিত ও পাকিস্তানীদের বিজাতীয় সংস্কৃতির ধারক বাহকদের পেছনের কাতারে ফেলে দিয়ে উচ্চ মধ্যবিত্তের ও নাগরিক ঢাকা ক্লাবের লোকদের তথাকথিত ঐ সুশীল আর উচ্চবিত্তদের বিপরীতে সাধারণ, নিম্নমধ্যবিত্ত,খেটে খাওয়া শ্রমিক, কৃষক, মেহনতি জনতা আর ছাত্র-তরুণদের মিলিত শক্তির প্রধান প্রতিভূ হিসেবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের একচ্ছত্র নেতৃত্বের ছত্র ছায়ায় ছাত্র-শ্রমিক-তরুণ বাঙালির যে নেতৃত্বে আকাঙ্ক্ষা ও রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অংশিদারিত্বের সুযোগ সৃষ্টি হয়, তা থেকে যোজন যোজন দূরত্বে রয়ে যায় ঐ উঁচু মার্গের শিক্ষিত নাগরিক ও ঢাকা ক্লাবের ব্রিটিশ পাকিস্তানীদের অক্সিলিয়ারি ফোর্সের সোজা বাংলার মাতব্বরেরা। বহুধা ধারায় ও বহুধা গোষ্ঠীতে বিভক্ত ও পেশাজীবীদের নানান ছকে আবদ্ধ এই শ্রেণীর নায়কেরা নিজেদের প্রতিপত্তি, ক্ষমতা, দাম্ভিকতা, তথ্য আর উঁচু মার্গের শাস্রীয় পাণ্ডিত্যের একচ্ছত্র বিচরণের ও নিজেদের আধিপত্যের স্থানচ্যুত হয়ে অনেকটা নিরুপায় হয়ে বলা যায় এক অসহায় সাবালক বালকের মতো বাঙালির সিংহ সাবক আর শ্রমিক, কৃষক,খেটে খাওয়া মানুষ আর মেহনতি জনতার সাথে মিশে যাওয়ার শত বৃথা চেষ্টার সেই আদি নাক ছিটকানো থেকে নতুন করে সৃষ্ট হওয়া ক্লাস ষ্ট্রাগলকে অতি সন্তর্পণে উস্কে দেয়ার আড়ালে সেই এলিট শ্রেণীর ক্লাব ঢাকা ক্লাবের শৃঙ্খলিত নিয়মের আড়ালে নিজেদের প্রতিপত্তি প্রতিষ্ঠার উদগ্র এক ভাবনা থেকে স্বাধীনতার পরবর্তী বিদেশী সেই ব্রিটিশ-আমেরিকা আর মধ্যপ্রাচ্যের আর্থিক সাহায্য নির্ভর আর্থিক প্রকল্প ও প্রকল্প উন্নয়ন, প্রাক্কলন আর নাগরিক দায়িত্ব জানানোর বাসনা নিয়ে সিপিডি নামক নয়া নামের এই প্রতিষ্ঠানের জন্ম।জন্মের পর থেকেই এই প্রতিষ্ঠান সব সময়ই ধনিক শ্রেণী এবং পুঁজিবাদী অর্থনীতির একচ্ছত্র বাহক, প্রচারক এবং তাদের সার্থক প্রতিনিধিত্ব করার যত কিছু করা দরকার এ যাবত কালে তারা করেই এসেছে নিঃসন্দেহে।

আমেরিকা যখন খোলাখুলি মুক্ত বাজার অর্থনীতির প্রচারে বিশ্ব মিডিয়ায় এই ইস্যুকে সামনে নিয়ে আসে, তখন বাংলাদেশ থেকে এই সিপিডি সেই মুক্তবাজার অর্থনীতির প্রচারে ছাতা ধরে এগিয়ে যায় বিনা প্রশ্নে। আবার ভারত, পাকিস্তান, ইরান, চীন, মিয়ানমার, ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া, কুয়েত যখন একই বাজার অর্থনীতির ছাতা নিয়ে এগিয়ে যায়, তখন সিপিডি নিজেদের মাল মশলা নিয়ে আরো সামনের কাতারে চলে আসে।কখনো বলেনা অতি মুক্তবাজার অর্থনীতি বাংলাদেশের মতো নয়া এক দেশের খেটে খাওয়া শ্রমিক, কৃষক, মেহনতি জনতার প্রান্তিক অবস্থানের বিপরীতে পরিমাণ ও মাত্রাগত সীমাবদ্ধতার মধ্যে দিয়ে ফলপ্রসূ খোলাবাজার অর্থনীতির অংশটুকু গ্রহণের পরামর্শ দেয়না, যেমন করে দেন একজন আজিজুল হক, কিংবা একজন সাঈদুজ্জামান, বা একজন প্রয়াত সাইফুর রহমান ও আজকের অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত।

বিশ্বব্যাংকের বা আইএমএফের প্রেসক্রিপশন কি করে বাংলাদেশে হুবহু বিক্রি করা যায়, তার একচ্ছত্র মনোপলি বিজনেসের উইং হয়ে বসে সিপিডি। কারণ বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ বা ডিএফআইডি, ইউএসএইড এর কাছ থেকে নিরবচ্ছিন্নভাবে আর্থিক অনুদানের আড়ালে আর কনসালটেন্সির তথাকথিত মোহে সিপিডির নির্বাহীরা পেয়ে বসেন বছরের বছর লাখো কোটি মার্কিন আর ইউরোপীয় ডলার ষ্টার্লিং। সেই অনুদানের ধারা অব্যাহত বা আর্থিক তারল্যের এই ধারা অব্যাহত রাখার জন্যে চাই বেশী করে সেমিনার, সংবাদ সম্মেলন আর তা হওয়া উচিত জাতীয় সংকট কালীন সময়ে বেশী করে সক্রিয় হওয়া উচিৎ । আর তা না হলে ঐ মার্কিন, ব্রিটিশ আর ইসরাইলি লবিষ্টদের কাছ থেকে আর্থিক অনুদানের বার্ষিক খাতওয়ারী অনুদান ও উপঢৌকন পাওয়া যাবেনা।

১৯৮২ সালে সামরিক স্বৈরাচার এরশাদ যখন সাত্তার সরকারকে হটিয়ে জগদ্দল পাথরের মতো জাতির কাঁধে ঝুলে বসে, তখনো এই সিপিডি আর নাগরিক সমাজের হর্তা কর্তারা থাকেন নীরব। বরং রাতের আধারে এরশাদের সামরিক শাসনের সাথে আঁতাত করে সকল রকম সুযোগ সুবিধা নয়টি বছর দিব্যি নেয়ার সেই সব চিত্র নিজ চোখে অবলোকন করার দুর্লভ সৌভাগ্য হয়েছিলো। নিজের চোখে দেখেছি এই সব সুশীল আর নাগরিক সমাজের শিক্ষিত ও উঁচু মার্গের নেতারা কেমন করে অনুদানের সেই সব কিস্তি সযত্নে নিয়ে জাতিকে তথাকথিত সুপারিশ নামা গেলানোর উদগ্র চেষ্টা করেছিলেন।সারা জাতি যখন এরশাদের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে তখনো আমাদের উঁচু মার্গের ঐ নাগরিক সমাজের নেতারা আর কর্তা ব্যক্তিরা ছিলেন সমস্ত কিছুর ধরা ছোঁয়ার বাইরে এবং একেবারে বিবেকহীন ও নিরুত্তাপ।সপ্তম সংশোধনী বৈধতা দিতেও সেদিন তাদেরকে প্রতিযোগিতার পেছনে দেখা যায়নি। আজকে পঞ্চদশ সংশোধনী নিয়েই তাদের যতোসব মাথা ব্যথা। কারণ ঐ অনুদানের মার্কিন ডলারকে জায়েজ করার জন্য চাই আরেকবার অসাংবিধানিক সরকার ব্যবস্থা।

সারা বছর দেশ চলে, সরকার চলে- সিপিডি ও নাগরিক সমাজ থাকেন নিরুত্তাপ। দেশ যখন সংকটকালিন সময় অতিবাহিত করে, তখনি এই নাগরিক আর সিপিডি হন সোচ্চার।

স্বাধীনতার ঠিক পরবর্তী বাংলাদেশ আর আজকের বাংলাদেশের মধ্যে অনেক তফাৎ – আমাদের নাগরিক আর সিপিডির নেতারা বেমালুম ভুলে যান।

১/১১ র সময় যে সব নাগরিক আর সিপিডির নেতারা বিলিয়ন ডলারের কালো টাকা ট্যাক্স ফাঁকি সাদা টাকা করেছেন, মামুন, ককো, সালমান, গিয়াস তাদের সাথে এদেরও নাম জাতি জানতে চায়। শুধু ব্যবসায়ীদের দুষ দেয়া হয়। যে সরকারই আসে, সে সরকারই শুরুতে রাজনীতিবিদ আর ব্যবসায়ীদের ঘাড়ে দুষ চাপিয়ে নিজেদের ক্ষমতার সিঁড়ি পাকাপোক্ত করে বসে। কিন্তু কখনো বলা হয়না, ব্যবসায়ী ও রাজনীতিবিদদের চাইতে আরো এক ভয়াবহ এক শ্রেণী আছে, যারা ঢাকা ক্লাবের ঐ অতি উঁচু মার্গের নাগরিক সমাজ, সুশীল সমাজ, সিপিডি ওয়ালারা, যারা প্রত্যেক সরকারের সময়ই সরকারের বিশেষ আনুকূল্য নিয়ে লক্ষ লক্ষ ডলার পাউন্ড কালো টাকা সাদা করে থাকেন। এতো কালো টাকা উনারা পান কিভাবে? জাতি সেসবও জানতে চায়।

একজন কাদের মোল্লার যখন ফাঁসি হয়, কিংবা শত শত গাছ কেটে রাস্তা ব্যারিকেড দিয়ে জনজীবন বিপর্যস্ত করে তুলা হয় অথবা রেল লাইন উপড়ে ফেলে হাজারো মানুষ মারার পরিকল্পনা করা হয় কিংবা চলন্ত বাসে পেট্রল বোমা মেরে মানুষকে হত্যা করা হয়-পাকিস্তান, আফগানিস্তানের ইজম বা স্টাইল বাংলাদেশের নিরাপদ জনপদে চালানোর হীন মানসিকতা করা হয়, তখন বোধগম্য কারণে থাকেন উনারা নীরব। কিন্তু কেন? একজন কৃষক, একজন শ্রমিক, একজন রিকশাওয়ালার বিবেক থাকলেও উনাদের বিবেক কোথায় বন্দী থাকে জাতি জানতে চায় ?

বাংলাদেশ নামক এই রাষ্ট্রটি যখন পাকিস্তানী সৈন্যদের দ্বারা নির্যাতিত ও বিপর্যস্ত হচ্ছিলো, মা বোন ভাইদের হত্যা নির্যাতন ও ধর্ষণ করা হচ্ছিলো, তখন আমাদের ঐ সিপিডি ওয়ালা আর নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা কি করেছিলেন- জাতি সেটাও জানতে চায়। যে রাজনীতিবিদ, যে সৈনিক, যে ছাত্র, যে শ্রমিক, যে কৃষক, যে সাহিত্যিক, যে সাংবাদিক, যে লেখক, তার জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়কে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে শত্রুর বিরুদ্ধে জীবন বাজী রেখে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পরে স্বাধীনতার লাল ঐ সূর্য ছিনিয়ে এনেছিলো- নাগরিক সমাজের ঐ দাবীদারেরা তখনো ছিলেন ধরা ছোঁয়ার বাইরে। নতুবা স্বাধীনতার ৪২ বছরের মাথায় এসে পাকিস্তানী রাষ্ট্র যখন বাংলাদেশের আদালতের রাষ্ট্রীয় বিচারের ঐ রায়ের বিপরীতে প্রকাশ্যে অবস্থান নিয়ে সংসদে নিন্দা প্রস্তাব আনে, তখনো থাকেন উনারা একেবারে ভাবলেশহীন। যেন এটা কেবল একজন হাসিনার একার যুদ্ধ। অথচ বাঙালির প্রাণের দাবী হাসিনার শাসনের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতার ৪২ বছরের মাথায় এসে বাস্তবে রূপ লাভ যখন করতে থাকে, তখন ঐ নাগরিক আর সিপিডি ওয়ালারা ভয়ে আঁতকে উঠেন। নতুবা নতুন এই মুক্তি সংগ্রামের অগ্রভাগে অবস্থানে তাদের আপত্তি কোথায় ?

একজন আবুল মাল আব্দুল মুহিত যখন বিরোধীদলে থেকে পরিবেশ আন্দোলনের সূচনা করেন, অর্থনীতির খুঁটিনাটি বিষয় নিয়ে বিশ্লেষণ করে বক্তব্য রাখেন, কনসালটেন্সি ব্যবসা নিয়ে সরব থাকেন, তখন সিপিডি ও নাগরিক সমাজের ঐ বোদ্ধারা মুহিতকে আহ্লাদে নিজেদের কোলে তুলে নেন। যেমন করে নেন একজন আতিউরকে।একজন আবুল বারাকাতকে। যখনি একজন মুহিত, একজন আতিউর, একজন বারাকাত জনগণের কাতারে এসে যুদ্ধাপরাধের বিচারে হন সোচ্চার, জনতার আর্থিক মান উন্নয়নে হন সচেষ্ট তখনি হয়ে যান ঐ সিপিডি ওয়ালাদের বিরাগভাজন। অনুদানের কিস্তি স্বচ্ছতার অজুহাতে মুহিত যখন আটকে দিতে উদ্যত হন, কিংবা বাংলাদেশ ব্যাংক সকল নাগরিকের জন্য সমান স্বচ্ছ নীতি অনুসরণ করে, সিপিডি ও নাগরিক ও এনজিওওয়ালারা তখন নাখোশ হন। কারণ স্বার্থে আঘাত লাগে, তাই মুহিত, আতিউর, বারাকাত এদেরকে বিদায় করো। কারণ এরা কিছু বুঝেনা। সব বুঝি আমরা সিপিডিওয়ালারা। নিউইয়র্ক আর ওয়াশিংটন আর লন্ডনে তাই ঘন ঘন বৈঠক চলে, কি করে হাসিনার সরকারকে বিদায় দেয়া যায়। নাহলে যে এবার আর কালো টাকা সাদা করার সুযোগ থাকবেনা। তাই এক ঢিলে দুই পাখি মারার কৌশল। হয় বিরাজমান সংঘাতের ডামাডোলে অসাংবিধানিক পথে ক্ষমতার আমন্ত্রণ-যাতে আপদও সরে, নিজেদের পথের কাটাও সরে, আর নিজেদের ক্ষমতা ও দাপট তখন পাকাপোক্ত হয়, কারণ তখনতো ঐ সিপিডি আর নাগরিক ছাড়া অসাংবিধানিক সরকারের জন্য আর কেউ সাহায্যকারী থাকেনা অবশিষ্ট। দ্বিতীয়ত: আপদ বিদায় না হলেও জামায়াতের মতো কট্টরদের আন্দোলন উস্কে দিয়ে সরকারে সিগন্যাল দেয়া আমাদের জন্য বিপদের কারণ হলে ঐ ভাবেই ঢিল সরকারের জন্য বরাদ্ধ থাকবে, তাতে সিপিডি আর নাগরিকেরা উদ্বেগের সাথে বিরাজমান সংঘাতকে আরো উস্কে দিবে। কিন্তু সিপিডি ওয়ালারা ভুলে যান, আজকের বাংলাদেশ তাদের সার্টিফিকেটের উপর ভর করে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। আজকের বাংলাদেশ তারুণ্যের বাংলাদেশ, যাদের চোখ কান মুখ সবই খোলা। আগের মতো তথ্য এখন আর অবরুদ্ধ কিংবা সিপিডির টেবিলে শুধু আবদ্ধ নয়। এখনকার যুগ তথ্য প্রবাহের অবাধ যুগ। এখনকার সময় একজন তরুণ অনায়াসেই বিশ্বের যেকোন প্রান্তে বসেই শুধু গুগল সার্চ করেই সব তথ্য সহজেই আত্মস্থ করে নিতে পারে।

বঙ্গবন্ধু যখন বাকশাল করেন, তখন সিপিডি আর ঐ নাগরিকেরা ছিলেন নিরুত্তর। জিয়াউর রহমান যখন ক্ষমতায় আরোহন করেন তখন ঐ নাগরিক আর সিপিডি ছিলেন নিরুত্তর। জিয়াউর রহমান কর্নেল তাহেরকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে হত্যা করেছিলেন, তখন ঐ নাগরিক, সুশীল, সিপিডি ছিলেন নিরুত্তর। এরশাদের সময়ও দর কষাকষিতে যতটা না সক্রিয় ছিলেন, ততোটাই নিরুত্তর ছিলেন সামরিক শাসন বিরোধী আন্দোলনে।

চীন, মালয়েশিয়া, জাপান, কোরিয়া যখন আর্থিক কোন প্যাকেজ নিয়ে এগিয়ে আসে, নিজদের হিস্যার বা পার্সেন্টেজের অনুদানের ভাগ সঠিক খাতে না আসলে চীন, জাপান, মালয়েশিয়া, কোরিয়ার প্রস্তাব হয়ে যায় বেশী ব্যয় বহুল, কষ্টসাধ্য, কিংবা আধুনিক প্রযুক্তির সাথে একটু পেছনে। বিপরীতে ওয়ার্ল্ড ব্যাংক, ইউএসএইড আর ডিএফআইডির প্রভাবিত প্রকল্প প্রস্তাব অধিক ব্যয়বহুল হলেও নিজেদের অনুদান, কনসালটেন্সির অবাধ সুযোগের হিস্যা আর পার্সেন্টেজের খাতে যথাযথ পেমেন্টের সুবাধে সেই প্রাক্কলন বায়ও হয়ে যায় দেশের জন্য মঙ্গলজনক।

উনারা সরব ও সক্রিয় হন ১/১১ র মতো পরিস্থিতির যখন উদ্ভব হয় বা এই রকম অবস্থায় উনাদের কদর যায় বেড়ে। আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তায় ভোগেন। ঐ অবস্থা যখন থাকেনা বা আর ফিরে আসার সম্ভাবনা অংকুরেই বিনষ্ট হতে দেখেন, তখনি নানা ছক আর ফর্মুলা আর বিদেশী কুশীলবদের ফর্মুলায় হয়ে উঠেন সক্রিয়। চলে সেমিনারের পর সেমিনার, টকশোর পর টক শো। ভালো কথা। অতি উত্তম তাদের বক্তব্য।আরো উত্তম হয়, আরো ভালো হয়, মাননীয় সুশীল নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা আর সিপিডির হর্তা কর্তারা, দেশের আপামর জনগণের কথা ভেবে যদি সঠিক বক্তব্য নিয়ে জাতির সামনে উপস্থিত হন। বিদেশীদের অনুদানের টাকায় সেমিনার আর বিশ্বব্যাংকের প্রেসক্রিপশন বাঙালিকে না গেলানোর চেষ্টা করে খাটি বাঙালি হিসেবে নিজেদের উদ্ভূত সমস্যাকে নিজেদের আবিষ্কৃত ফর্মুলার আলোকে সমাধানের পন্থা বাতলে দিয়ে জাতিকে, দেশকে উপকৃত করতে পারেন। আর তা না করতে পারলে দয়া করে আর বিদেশীদের ভাড়াটিয়া হিসেবে নিজেদের জানান না দিয়ে সম্মানের আসনে থাকুন। জাতি আপনাদের ঐ মতো মানী লোকদের সম্মানীর আসনেই দেখতে চায়।

বাংলাদেশ এমন এক দেশ, যে জাতির রয়েছে লড়াই করে জয়ী হওয়ার এক দুর্লভ ইতিহাস। পক্ষান্তরে বাঙালি এমন এক সংকর মিশ্রিত জাতি যে জাতি পরাজয়ে কখনো ডরেনা, লড়াই করে যাওয়ার সহজাত এক অভ্যাস এই বীরের জাতির। এখানে যেমন পাল বংশ বহুকাল শাসন করেছে, আবার পতন হয়েছে। একই ধারাবাহিকতায় এখানে মোঘল সাম্রাজ্যের নয়শত বছরের শাসনের ইতিহাস রয়েছে, আবার তাদের নিষ্ঠুর পতনের ইতিহাসও সমানভাবে রয়েছে। আর্য, অনার্য থেকে শুরু করে বহু চড়াই উতরাইয়ের পর অবশেষে বাংলার বীর মুক্তিযোদ্ধাদের জীবনবাজী যুদ্ধের ফলে এই বাংলার জন্ম ইতিহাসের সকল সমীকরণ এবং ঐতিহাসিকদের সকল ধ্যান ধারণাকে ভুল প্রমাণিত করে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বিজয়ের ঐ লাল সূর্যটাকে এই বাঙালিই ছিনিয়ে এনেছে। ইতিহাসের ক্রান্তিকাল যেমন এই বাঙালি অতিক্রম করেছে, তেমনি ইতিহাসের সবচাইতে গৌরবোজ্জ্বল অংশেরও সমান অংশীদার এই বাঙ্গালি। বাঙালিকে জাগ্রত ও নব চেতনার উন্মেষ ঘটানোর জন্যে ধার করা কোন হ্যামিলনের বংশীবাদকের প্রয়োজন পড়বেনা। বাঙালি তার আপন প্রয়োজনেই হ্যামিলনের বংশীওয়ালার জন্ম দিতে জানে, চিনে নিতে ভুল করেনা।

ভুল করেনা বলেই হঠাত করে জাতির ক্রান্তিকালে নাগরিক সমাজের সেমিনারের নামে যারা এর আয়োজন করেছিলেন, তাদের উদ্দেশ্য যে মহৎ ছিলোনা, সেটা জলের মতো পরিষ্কার। কারণ তারা চেয়েছিলেন তাদের এই উদ্বেগের সজাগ হয়ে রাতের আধারে অসাংবিধানিক শক্তি ক্ষমতায় আসুক। সেজন্যে তারা তৈরিও ছিলেন। তাদের ঐ পাতানো খেলায় শরিক হয়নি আওয়ামীলীগ ও তাদের নেতৃত্ব, আ স ম আবদুর রব, ডঃ কামাল হোসেন, মাহমুদুর রহমান মান্না ও তার নাগরিক ফোরাম, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী তালুকদার মনিরুজ্জামান, ডঃ আতাউর রহমান, ডঃ হারুন অর রশীদ, ডঃ আনোয়ার হোসেন, আবুল মাল আব্দুল মুহিত, ডঃ আবুল বারাকাত সহ আরো অনেকেই। লক্ষণীয় যে, নাগরিক সমাজের ব্যানারে ঐ জাতীয় সেমিনারে, জাতির একেবারে ক্রান্তিকালের ঠিক আগ মুহূর্তে যারা অংশ নিয়েছিলেন,তাদের ৯৭% দুটি বিশেষ রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিত্বকারী ছাড়া আর কেউ ছিলেননা। ব্যতিক্রম শুধু একজন রাশেদ খান মেনন। রাষ্ট্রের এতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তারা মতামতের আয়োজন করলেন, অথচ একজনও রাষ্ট্রবিজ্ঞানী সেই সেমিনারে নেই। যে রব বিগত ৩০ বছর ধরে, যে মান্না বিগত তিনটি বছর ধরে রাজনৈতিক কালচার পরিবর্তনের জন্য প্রাণান্ত চেষ্টা করে চলেছেন, সেই রব, সেই মান্না(যারা পরিবর্তনের রাজনীতির কথা বলেন) এবং রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা থেকে যান অনুপস্থিত। প্রশ্ন হলো কিন্তু কেন ? তবে কি বাংলাদেশের রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা জাতীয় সংকটকালীন সময়ের অবস্থার দিক নির্দেশনা ও মতামত দিতে অজ্ঞ নাকি অপারগ নাকি তাদেরকে এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে ইচ্ছাকৃত ভাবে, যদি না উনারা সিপিডিওয়ালাদের সাথে একমত হন। সিপিডি জানে রব মান্না তাদের সাথে কখনো একমত হবেনা। যদিও ইউনুসের প্রশ্নে রব মান্না একমত পোষণ করে। কিন্তু সিপিডি ইউনূসের সাথে গোপন বৈঠক করে লন্ডন ও ওয়াশিংটনে। মান্না-রব, আর রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের সেটা অজানা নয়। যেমন অজানা নয় জাতি সংঘের রাজনৈতিক শাখার, সেই সূত্রে জাতি সংঘের বাংলাদেশ অফিসও অবগত হয়ে যায়। আর সেই শঙ্কা থেকেই সিপিডি মান্না রব, আর রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের রাখে দূরে। কিন্তু হায় বাঙালি এবার তাদের চালে ধরা দেয়নি। কারণ বাংলাদেশ বিগত ১/১১ কুশীলবদের কার্যক্রম ও তাদের অন্ধকারের হাত নিয়ে এখন অনেক সজাগ এবং বলা যায় বিস্তর অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ। বাঙালির নিজস্ব হ্যামিলন ওয়ালাই কেবল এখানে বাঁশি বাজাবে, ভাড়াটিয়া কেউ নয়-বাঙালি আরেকবার সেটাই ভালোকরেই জানিয়ে দিলো( এখানে বাঙালি বলতে বাংলার রাজনীতিবিদ, বাংলার ছাত্র সমাজ, বাংলার তরুণ, বাংলার ব্যবসায়ী, বাংলার সেনাবাহিনী, বাংলার পুলিশ, বাংলার আনসার, বাংলার বিজিবি, বাংলার র্যালব, বাংলার সাহিত্যিক, বাংলার লেখক, বাংলার সাংবাদিক, বাংলার পেশাজীবী, বাংলার শ্রমিক, বাংলার ঠেলাওয়ালা, বাংলার বুদ্ধিজীবী, বাংলার সুশীল সমাজ, বাংলার প্রবাসী- সহ যারা সঠিক তথ্য সঠিক চ্যানেলে সরবরাহ করে থাকেন- এক কথায় সকল বাঙালি মাত্রই )।

29th December 2013.

Please follow and like us:

Add a Comment

Your email address will not be published.

Follow by Email
YouTube
Pinterest
LinkedIn
Share
Instagram
error: Content is protected !!