ত্রিমুখী ষড়যন্ত্রের মুখে গার্মেন্টস ইন্ডাস্ট্রিঃ সরকার, প্রশাসন, বিজেএমইএ করছে কি ?

ত্রিমুখী ষড়যন্ত্রের মুখে গার্মেন্টস ইন্ডাস্ট্রিঃ সরকার, প্রশাসন, বিজেএমইএ করছে কি ?

** বার্ষিক টার্ণওভার বিশ বিলিয়ন ডলার-বিবিসি
** ভারতীয় বেশীর ভাগ নাগরিক এখন বাইয়িং হাউসের মালিক- ইনকিলাব
** শ্রমিকদের বেতন ৮ হাজার না করলে গার্মেন্টসে মাছিও ঢুকবেনা-মন্ত্রী শাহজাহান খান
** ফেড আপ ইন বাংলাদেশ- নিউ ইয়র্ক টাইমস
** উৎপাদন ক্ষতি ৩শ কোটি টাকা-বিজিএমইএ
** ৬ দিন গার্মেন্টস বন্ধে ক্ষতি ৫ বিলিয়ন টাকার অংকে- অনুসন্ধানী প্রতিবেদন
** ৩৫টিরও বেশী ইন্ডিয়ান শিল্প প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে বিনিয়োগ করেছে- কনফেডারেশন অব ইন্ডিয়া
** বাংলাদেশের গার্মেন্টস বাজার দখলে নিতে ভারতীয়রা তৎপর- এনএসআই এর নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কর্মকর্তা, সূত্র ইনকিলাব

এই পর্যন্ত উপরে উল্লেখিত সারণী মাথায় রেখে আমরা এখন দেখবো আমাদের সম্ভাবনায় গার্মেন্টস ইন্ডাস্ট্রিতে দিনের পর দিন বিশৃঙ্খলা, উৎপাদন ব্যাহত, আর এই বিপুল লাভজনক খাতকে নিয়ে আসলে কি হচ্ছে।

প্রচুর সম্ভাবনা আর লাভজনক এই পোশাক শিল্প:

বাংলাদেশ সারা বিশ্বের কাছে খরা, বন্যা, টর্নেডো, সিডর, দূর্ণীতিগ্রস্থ আর রাজনীতির হানাহানি, বিদ্বেষ পূর্ণ এক দেশের দুর্লভ এক সম্মানের, দুর্নামের অধিকারী। ক্রমবর্ধমান বিশাল জনগোষ্ঠী আর রাজনৈতিক নেতাদের নিত্য নতুন ঝগড়া, ফ্যাসাদ, আজকের হালের তথাকথিত জঙ্গি, হুজি, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ছাড়া কালে ভদ্রে এই বাংলাদেশ বিপুল সম্ভাবনা ও এর বিশাল এক দক্ষ প্রফেশনাল উদ্যমী তারুণ্যের শক্তি থাকা সত্বেও বিশ্ব মিডিয়ার শিরোনাম কখনো হয়না, যদি না এখানে কোন রাজনৈতিক হানাহানি, হিংসা, বিদ্বেষ আর সিডর, ঘূর্ণিঝড় কিংবা তাজরীন, রানা প্লাজার মতো ধ্বংসাবশেষ আর হাজারের উপরে লাশের পর লাশের দুর্গন্ধযুক্ত ছবি প্রকাশিত না হয়।

অথচ এর বিপরীতে রয়েছে, প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অপূর্ব লীলাভূমি সমৃদ্ধ এক নৈসর্গিক দৃশ্যাবলী, বিশাল বনজ সম্পদ, বিশ্ব সেরা দুর্লভ ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্য মণ্ডিত বিশাল লম্বা এক সমুদ্র উপকূল-কক্সবাজার সী-বীচ, আধুনিক বিশ্বের পোশাক শিল্পের গর্বিত এক যোগান ও সরবরাহকারীর বিশ্ব সেরা নাম বাংলাদেশের গার্মেন্টস ইন্ডাস্ট্রি, বিশাল এক মানব সম্পদ ও এর তারুণ্যের উচ্ছ্বাসে উদ্দীপ্ত যুব সমাজ, ডঃ মোহাম্মদ ইউনুস ও এর গ্রামীণের মতো কর্মচঞ্চল এক বিশ্ব সেরা ক্ষেত্র, দুর্লভ বিশ্ব সেরা অভিযাত্রীদের একদল দক্ষ যাত্রী- অথচ অসাধারণ, ব্যতিক্রমধর্মী সেই সব দক্ষ সেবাদানকারি ব্যক্তি, উদ্যমী ও ক্ষেত্র থাকা সত্বেও আমাদের সেই সব সোনার ছেলে আর ইর্ষনীয় সাফল্য ধারীদের খবর বিশ্ব শিরোনাম হয়না, যদিনা এখানে বন্যা, খরা, দুর্নীতি, গার্মেন্টস লুট, অগ্নিসংযোগ, জ্বালাও-পোড়াও, আর লাশের স্তূপ না হয় ।

আমাদের সীমাবদ্ধ সম্পদ আর কতিপয় লুটপাটকারি রাজনৈতিক নেতা-গোষ্ঠী, কতিপয় লোভী আমলা ও এর তন্ত্র, দালাল, ফড়িয়া চক্র, আর চক্রান্তকারী, তাঁবেদারি গোষ্ঠীদের সকল চক্রান্ত, বাধা, পদে পদে লাল ফিতার দৌরাত্মের সীমাহীন অবিশ্বাস্য বাধা ডিঙ্গিয়ে একদল সাহসী, দক্ষ, আর প্রফেশনাল উদ্যোক্তাদের অদম্য সাহস আর অক্লান্ত পরিশ্রমের ফলে আমাদের এখানে গড়ে উঠা গার্মেন্টস ইন্ডাস্ট্রি নামক এই শিল্প এখন সারা বিশ্বের কাছে বিস্ময়ের জন্মই শুধু দেয়নি, সারা বিশ্বের মধ্যে সব চাইতে কম প্রতিযোগিতা আর কম মূল্যের শ্রমিকের কর্মের স্পৃহার এক অদম্য দুর্নিবার মিলিত শক্তির সমন্বয়ে আমরা কম ও স্বল্প সময়ের ব্যবধানে বিশ্বের যেকোন প্রান্তের, যে কোন অর্ডার সরবরাহের দুর্লভ এক সুনামের অধিকারী হয়ে সবে মাত্র বিশ্বকে যখন জানান দিতে যাবো- তাবৎ পৃথিবীতে আদিমকালে যেমন ছিলো এই বাংলার মসলিন বিশ্বসেরা, তেমনি আজকের পরিবর্তিত বিশ্বে বাংলার পোশাক শিল্পও সারা বিশ্বের যেকোন সরবরাহকারী, উৎপাদনকারীদের তুলনায় ও প্রতিযোগিতায় বিশ্ব সেরা- ঠিক তখনি শুরু হয়ে গেছে এই সম্ভাবনাময় ও লাভজনক পোশাক খাতকে কি করে ধ্বংস করে একেবারে তলানিতে নিয়ে আসা যায়। আর এর আন্তর্জাতিক গোষ্ঠীর চক্রান্তের সাথে খোদ বাঙালির একটি অংশ, যেমন করে বাংলার শেষ নবাব সিরাজ উদ্দৌলার পতনের প্রাক্কালে এই বাংলার বাঙালি মীরজাফর আলীখাদের মতো চক্রান্তকারীদের ন্যায়, আজকেও এই দুঃখিনী বাংলায় কতিপয় বাঙালির লোভ,লালসা আর আন্তর্জাতিক চক্রান্তকারীদের তল্পিবাহক হিসেবে নিজেদের আখের গোছানোতে ব্যস্ত দেখে হতবাক হইনা, বরং লজ্জিত ও অপমানিত হই।

বিবিসি প্যানোরমাঃ

বাংলাদেশের গার্মেন্টস খাত নিয়ে সম্প্রতি বিবিসি টেলিভিশন তাদের প্যানোরমা অনুষ্ঠানে এই খাতের বিপুল সম্ভাবনা ও বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের চাবি কাঠি হিসেবে ব্যাপক ভিত্তিক তথ্য সম্বলিত রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে, যা তাবৎ দুনিয়ার ও মিডিয়ার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। বিবিসির ভাষ্যমতে বাংলাদেশ এখনি এই খাত থেকে বছরে ২০ বিলিয়ন ডলারের টার্ণওভার করে থাকে, যা থেকে পরিকল্পিত সরকারি উন্নয়ন পরিকল্পনার আওতায় নিয়ে এসে এবং দক্ষ, এফিসিয়েন্সী শ্রমিক-কর্ম-উদ্দীপনা ও যোগোপযোগি মানেজম্যান্টের মাধ্যমে এই খাত থেকে বাংলাদেশ তার জিডিপির হার বৃদ্ধি শুধু নয়, উন্নয়নের সুপার মডেল হতে পারে।

তাজরীন দুর্ঘটনার পর রানা প্লাজার ধ্বংসাবশেষ:

বিবিসির এই প্যানোরমা যখন প্রকাশিত হয়, ঠিক তার কিছু পরে বাংলাদেশের প্রভাবশালী গার্মেন্টস উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান তাজরীন-এ আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে যায় দুশোরও শ্রমিক কর্মচারী। তাজরীনের আগুনে পুড়ে অঙ্গার হওয়া ছাইয়ের গন্ধ বাতাসে শুকাতে না শুকাতেই বাংলাদেশের গার্মেন্টস ইতিহাসে সবচাইতে ন্যক্কারজনক ও মানব ইতিহাসের সবচাইতে কলঙ্কময় এক দুর্ঘটনা তথা মানবসৃষ্ট দুর্ঘটনা ঘটে যায়, যেখানে একহাজারেরও উপরে শ্রমিক ভবনের নীচে লাশ হয়ে উদ্ধার হয়ে আসে। যার রেশ আজও সারা বিশ্বের মিডিয়ার শিরোনাম ও এর ফলে বিশ্বের নামকরা গার্মেন্টস আমদানীকারকদের একের পর শর্তের বেড়াজালে পড়ে বাংলাদেশের আতুর এই গার্মেন্টস শিল্প বিশাল ধাক্কা খেতে থাকে। প্রতিনিয়ত খুড়িয়ে খুড়িয়ে চলা এই পোশাক শিল্প এখন নানামুখী চাপ, আইনের কাঠামো, দেশী-বিদেশী নানান ষড়যন্ত্রে পড়ে বলা যায় এক অস্বস্তিকর ও গুদের উপর বিষফোঁড়ার ন্যায় কাজ করে চলছে, অথচ এর বিপরীতে সরকার, প্রশাসন, সংশ্লিষ্ট পোশাক রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান, এদের সংগঠন, শ্রমিক শ্রেণির স্বার্থরক্ষাকারি সংগঠন, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী, কর্তাব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান, আর আমাদের মাথামোটা বিশাল আমলাতন্ত্রের ঐ প্রতিষ্ঠান যেন দেখেও না দেখার ভান কিংবা ঠাকুর ঘরে কে রে আমি কলা খাইনারে- এই যখন অবস্থা, তখনি একজন সচেতন বাঙালি, সাধারণ বাঙালি মাত্রই শঙ্কিত ও হতবিহবল না হয়ে পারিনা।

সরকার ও গার্মেন্টস ইন্ডাষ্ট্রিঃ

জনকল্যাণধর্মী সরকারের কাজই হলো দুষ্টের দমন ও শিষ্টের পালন। রাষ্ট্রের নাগরিকের জীবন-মানের নিরাপত্তা আর উদ্যোক্তা-ব্যবসায়ীদের সহায়কের ভূমিকা পালন। অথচ সরকার নিজেই হয়ে আছে লুটপাটকারীর সহায়ক, দুষ্টের ও জ্বালাও-পোড়াওয়ের সহায়ক, শ্রমিক শ্রেণীর স্বার্থ-রক্ষাকারী তৃতীয় সহায়ক প্রতিষ্ঠান হওয়ার পরিবর্তে সরকার হয়ে আছে শ্রমিক শ্রেণীর বিরুদ্ধে ও উস্কে দেয়ার অক্সিলিয়ারি এক শক্তি।গার্মেন্টস শ্রমিকদের মজুরী, বেতন কাঠামো আধুনিক ও যুগোপযোগী এবং উন্নত করা যেমন সময়ের দাবি, তেমনি শ্রমিক-কর্মচারীদের কাজের পরিবেশ ও পেশাগত দক্ষতা অর্জনে, সর্বাধিক দক্ষতা সম্পন্ন শ্রমিক-কর্মচারী তৈরির সহায়ক হিসেবে সরকার হবে আন্তরিক এবং বিশ্বস্ত। পাশাপাশি গার্মেন্টস মালিক, শ্রমিক, উৎপাদন, কর্মপরিবেশ, কর্মশৃংখলা, বেতন, মজুরী, কাজের গুণগত মান উন্নয়ন ও দক্ষতা বৃদ্ধিতে সকল অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও সেই সাথে উন্নত হাইজিন ও নিরাপত্তারমতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়াদি সু-সমন্বয়ের মাধ্যমে সম্পন্ন করবেন, এটাই স্বাভাবিক। শ্রমিকদের কাছ থেকে সর্বাধিক কাজের নিশ্চয়তা আশা করতে হলে যেমন দরকার তার কাজের পরিবেশের উন্নয়ন ও বেতন মজুরী কাঠামোর উন্নয়ন ও বৃদ্ধি, একই সাথে দরকার মানব-কল্যাণে মালিক পক্ষেরও আরো উদার মনোভাব ও ত্বরিত একশনের। সবকিছু সরকার করে দিবে এমন আশা করাটাও বাস্তব ও যুক্তি সঙ্গত নয়।

এখানেই রয়ে গেছে আমাদের পোশাক শিল্পের সবচাইতে বড় গ্যাপ ও গলদ- যা থেকে ফায়দা নিচ্ছে দেশী, বিদেশী স্বার্থান্বেষী ও কায়েমি স্বার্থ বাদী গোষ্ঠী।আর সেটা সত্যি সরকারি ও বেসরকারি ও ব্যক্তি পর্যায়ের ক্ষেত্রে সমানভাবে।

কিছু সংবাদ, ইনকিলাব প্রতিবেদন আর বিশ্ব মিডিয়ায় আমাদের গার্মেন্টস শিল্প:

“ন্যাশনাল সিকিউরিটি ইন্টেলিজেন্সের (এনএসআই) শিল্প বিভাগের এক কর্মকর্তা ইনকিলাবকে জানিয়েছেন, বাংলাদেশের পোশাক শিল্প দখলে নিতে ভারতের একাধিক পরিকল্পনা রয়েছে। এগুলো ধীরে ধীরে বাস্তবায়ন হচ্ছে। ইতোমধ্যে পরিকল্পিতভাবে শ্রমিক অসন্তোষ সৃষ্টি করে এই শিল্পকে রুগ্ন বানানো হচ্ছে। আর রুগ্ন শিল্পগুলোর মালিকানা ভারতীয়রা নিয়ে নিচ্ছে। আর দক্ষ টেকনিশিয়ানের নামে ইতোমধ্যেই আড়াই হাজার ভারতীয়কে দেশের পোশাক খাতে ঢুকিয়ে দেয়া হয়েছে। এরা কারখানাগুলোর গুরুত্বপূর্ণ পদে রয়েছেন। এছাড়া এই খাতের অর্ধেকের বেশি বাইং হাউজের মালিক ভারতীয় নাগরিক।“ মাত্র দুদিন আগে দৈনিক ইনকিলাব ঠিক এরকম উদ্ধৃতি দিয়ে প্রধান শিরোনামে অনুসন্ধানী এক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। ইনকিলাব যখন এরকম সংবাদ প্রকাশ করে তারও আগ থেকে বিশ্ব মিডিয়ায় বাংলাদেশের গার্মেন্টস শিল্প নিয়ে নানান উদ্বেগজনক সংবাদ প্রকাশ করে আসছিলো। সেই দৌড়ে যেমন রয়েছে নিউ ইয়র্ক টাইমস, সিএনএন, তেমনি রয়েছে প্রভাবশালী ব্রিটিশ মিডিয়া বিবিসি, গার্ডিয়ান, টাইমস, টেলিগ্রাফ, ইকোনোমিষ্ট, একই সাথে সমানতালে পাল্লা দিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে চলেছে আরবের কাতার ভিত্তিক আজকের জনপ্রিয় টেলিভিশন নেটওয়ার্ক আল-জাজিরা।এই সব সংবাদ, প্রতিবেদন কোন কোনটা আমাদের গার্মেন্টস শিল্পের জন্য অবশ্যই যেমন উদ্বেগজনক, একই সাথে বিদেশী উদ্যোক্তা, ক্রেতা ও বাইয়ারদের জন্য নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে তাতে কোন সন্দেহ নেই। ইতিমধ্যে বড় মাপের ক্রেতা প্রাইমার্ক, ওয়ালমার্ট, টেসকো, আসডা, নেক্সট, বার্টন, মার্ক্স এন্ড স্পেন্সার, প্রভৃতি ক্রেতা বাংলাদেশ থেকে পোশাক নিতে নানা শর্ত ও ছল-চাতুরী করছে। এহেন অবস্থায় বাংলাদেশ সরকার ও পোশাক শিল্পের মালিক-শ্রমিকদের কার্য ও ভূমিকা কেমন হওয়া উচিৎ, তার নিরিখে নির্ধারণ করা এখন সময়ের সবচাইতে বড় দাবি। অথচ সরকার, মালিক, শ্রমিক অন্য এক খেলায় মত্ত। সব কিছুতে যদি রাজনীতি রাজনীতি, স্বার্থ নীতি, আর জুচ্চুরি খেলা খেলি, তাহলেতো এনএসআইয়ের ঐ কর্মকর্তার শঙ্কা কিংবা তথ্য কিংবা বার্তা যাই বলিনা কেন, তা বাস্তবে রূপ নিতে বেশি সময়ের কি দরকার আছে ?

পোশাক শিল্পের সাথে জড়িত মোহাম্মদ হাতেম এনএসআইয়ের ঐ কর্মকর্তার তথ্যের সাথে একমত পোষণ করেছেন। আমাদের ঢাকার বায়িং হাউসের সাথে যারা জড়িত, তারা ভালো করেই জানেন ইনকিলাব কোন স্বার্থান্বেষী সংবাদ প্রচার করেনি। কেননা ঢাকার গার্মেন্টস এর প্রায় টেকনিক্যাল অনেক প্রভাবশালী পোষ্টে এখন ভারতীয়দের আধিপত্য।

আমি ভারতীয় কিংবা অন্যদেশের নাগরিকদের প্রাধান্যের বিরোধী নই। কিন্তু কেবলমাত্র দক্ষতার নাম করে দেশীয় দক্ষ ও এফিশিয়েন্ট গ্রাজুয়েটদের বসিয়ে রেখে বা নিয়োগের অজুহাত দেখিয়ে বিদেশীদের একতরফা নিয়োগে কোন জাতীয় স্বার্থ কাজ করছে, সরকারের সে বিষয়টাও খতিয়ে দেখা উচিৎ ।আর এই সুযোগে ঐ কর্মকর্তারা মিলে মিশে বা পেছনে মাষ্টার মাইন্ড করে গরীব-নিরীহ শ্রমিকদের মোটা অংকের লোভে ফেলে শ্রমিকদের জ্বালাও-পোড়াও আন্দোলন ও অস্র লুটের মতো হিংসাত্মক কর্মকাণ্ড করার পেছনে মোটিভ খতিয়ে দেখতে সরকারের বাধা কোথায়?

চীন, ভারত, মায়ানমার, ভিয়েতনাম:

আমাদের গার্মেন্টস এর বিশ্বব্যাপী ঈর্ষনীয় সাফল্যে নানা মত ও পথের অমিল থাকা সত্বেও বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের বিশ্বব্যাপী রেকর্ডের ভাগে হাত বসানোর জন্যে একাট্রা আজ চীন, ভারত, মায়ানমার আর ভিয়েতনাম।এতো রাজনৈতিক ও আদর্শিক অমিল থাকা সত্বেও অর্থনৈতিক জোনের সুবিধাহেতু বাংলাদেশ বিরোধী গোপন ষ্ট্রাটেজী এই চার-স্বপ্ন বিলাসী আধুনিক সুযোগের সদব্যবহারকারী প্রবাসী রাষ্ট্রদূতদের প্রায়ই রাষ্ট্রীয় আচারের আলোচনার এজেন্ডায় থাকে বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের নেতিবাচক ও দুর্বল দিকগুলো আইডেনটিফাই করে কি করে দুর্বলতার সুযোগ নিজেদের অনুকূলে নিয়ে এ বাজারের বিশ্বব্যাপী দখলের নেতৃত্বে আসনে চলে আসা, আজকের হাই-টেকের দিকে ঝুঁকে থাকা চীন এবং গণতন্ত্রের বিশাল প্রতিষ্ঠানের একক দাবীদার বড় দাদা ভারতের, সেই অতি ধীরে ও সঙ্গোপনে চলে আসা মায়ানমার ও ভিয়েতনামের পশ্চিমা ও ইউরোপ প্রীতি নয়া সংস্করণে মূলত পুঁজিবাদী অর্থনীতির নয়া ও খোলা মতের সংস্করণ কাজ করছে সর্বাগ্রে। অথচ আমরা নিজেদের মারামারি আর জালাও পোড়াওয়ের নীতি থেকে এখনো বেরিয়ে আসতে পারছিনা।

তার উপর আছে, আমাদের অতি উগ্র, জেদি, অহংকারী, একরোখা, একচোখা সরকারী আমলা, মন্ত্রী আর কতিপয় এনজিওর অসাধু কর্মকর্তা মিলে বিদেশীদের টাকা আর ডলারের লোভে নিজেদের পকেট ভারীর দুর্দমনীয় এক অবিনাশী শিশার টানে স্বপ্নে বিভোর বাঙালির স্বার্থ বিরোধী সেই মীরজাফর আলী খা আর ঘষেটি বেগমদের উত্তরসূরিরা ( রক্তেই তা প্রবাহিত, চিরন্তন এই দুষিত রক্ত কি করে ক্লিন করা যায়-ভেবে দেখা দরকার মনোবিজ্ঞানী আর সমাজবিজ্ঞানীদের) অতি আহামরি ও শ্রমিক শ্রেণীর স্বার্থের কথা বলে, তাণ্ডব আর হিংস্রতার আদিম উন্মত্ততায় লেলিয়ে দিয়ে গার্মেন্টস শিল্পকে করে তুলছে অস্থিতিশীল- সরকারের কাছে এমন তথ্য থাকা সত্বেও কেন এর প্রতিকারের নিচ্ছেনা ব্যবস্থা, বোধগম্যই নয়। কোথায় সরকারের হাত-পা বাঁধা –জাতি জানতে চায়।কেন নৌ মন্ত্রী হুমকি দিয়ে শ্রমিকদের উস্কে দিলেন? নিছক রাজনীতি না অন্য কিছু, সেসব খতিয়ে দেখতে বাধা কোথায় ?

প্রাইমার্ক বলছে, তারা রানা প্লাজায় ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ দিচ্ছে।সরকার বিভিন্ন ব্যাংক ও দাতাদের কাছ থেকে ফান্ড গ্রহণ করছে। টেলিভিশন মিডিয়ায় ফলাও করে আসছে। তাহলে এর প্রকৃত পরিসংখ্যান শ্রমিকদের কাছে উপস্থাপনে বাধা কোথায় ? কোথায় যেন একটা খেলা খেলা হচ্ছে। আবারো শ্রমিক ও মালিকদের কেউ কেউ জ্ঞাতে-অজ্ঞাতে কারো খেলার ঘুঁটি হিসেবে ব্যবহ্রত হচ্ছেন।

লন্ডনের ইকোনোমিষ্ট এবং গার্ডিয়ান এখন হরহামেশাই রানা প্লাজার পরবর্তী অবস্থা ও আমাদের গার্মেন্টস ইন্ডাস্ট্রির উপর রিপোর্ট প্রকাশ করে চলেছে। এ ক্ষেত্রে মালিক, শ্রমিক, সরকারের মধ্যে এতো দ্বন্ধ, এতো অসামঞ্জস্যতা বেড়েই চলছে, কিন্তু কেন? এতোবড় মানবসৃষ্ট মৃত্যুর স্তূপ ঘটে গেলো, অথচ সরকার ও মালিক, শ্রমিকেরা যেন কিছুই হয়নি- এমন ভাব নিয়ে আছেন। কিন্তু এভাবে আর কতোকাল চলবে। মার্কিন বাজারে জিএসপি সুবিধা বাতিল এবং তৎপরবর্তী রাজনীতি আর আজকে জাতি সংঘের ভাষণে প্রধানমন্ত্রীর জিএসপি সংক্রান্ত এড্রেস কোন কূটনৈতিক ইতিবাচকতার উপর ভর করে করা হয়েছে, অন্তত পোশাক শিল্পের উন্নয়ন ও ভবিষ্যতের কথা বিবেচনা করে আমাদের মার্কিন ও ইউরোপীয় কূটনীতি কেমন হওয়া উচিত, তা ভেবে দেখার সময় এসেছে।

গার্মেন্টস ইন্ডাস্ট্রি,মালিক, শ্রমিক, সরকার:

পোশাক শিল্পের স্বার্থে এবং এর উন্নয়ন ও অন্যান্য সকল কিছুর জন্যে উপরে উল্লেখিত সকল স্টেক হোল্ডার তথা মালিক, শ্রমিক, সরকারের মধ্যে কেমন করে এক সুন্দর সমন্বয় করা যায়, সে লক্ষ্যে কাজের বিপরীতে এখানে দেখা যায় প্রতি নিয়ত মালিক-শ্রমিক দ্বন্ধ, মালিক-শ্রমিক-সরকার একে অন্যের শত্রু।তাহলে এই খাতের সমস্যা সঠিকভাবে চিহ্নিত হয়ে এর যথাযথ উন্নয়ন কি করে হবে ?

বিজেএমইএ, সরকার, শ্রমিকনেতা, সংবাদপত্র বলছে টানা দিনের পর দিন, একনাগারে ৬ দিন বন্ধ রাখার ফলে পোশাক শিল্প ৫ বিলিয়নের মতো টাকা ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। বিজেএমই গতকালও এমন করে আক্ষেপ করেছে। সরকারও নসিহত করছে।তাহলে জাতি এতো ক্ষতি কি করে বইছে হে নেতা-নেত্রীরা বলবেন কি ?

বার বার ধ্বংসাবশেষ, আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে অঙ্গার হওয়া নিরীহ শ্রমিক, হরতাল, ঘেরাও, অহেতুক লে-অফ, আনসার পুলিশের অস্র লুট, কারখানায় আগুন, এতোসব ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড বার বার ঘটেই চলছে, একের পর এক কারখানা বন্ধ হচ্ছে, উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, বিদেশী বায়ার ও ক্রেতারা মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে, আর সরকার, মালিক, শ্রমিক নেতারা নিজেদের রাজনৈতিক খেলা আর স্বার্থের ফটকাবাজীতে একের পর এক কৌশল আর কারসাজী করে চলছে- যেন দেখভাল করার জন্য কেউ আর এখানে নেই। এভাবেতো একটা দেশের সম্ভাবনাময় পোশাক শিল্প ধ্বংস হয়ে যেতে পারেনা ?

বাঙালি বীরের জাতি, গরীব হতে পারে, কিন্তু বিশ্বে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর মত সাহসী জাতির নাম যাদের ললাটে, তারা এভাবে নিজেদের শ্রমিকের তিল তিল ঘর্মাক্তে আর রক্তে গড়া এই খাত অন্য কারো চক্রান্তে কিংবা নব্য নীলচাষীদের নিজেদের স্বার্থের অনুকূলে আত্মাহুতি দিতে পারেনা-কুচক্রী আর সন্ত্রাসের মদদ আর তাদের কুশীলবদের এই ম্যাসেজটা ভালো করেই দেয়ার সময় এখনি। কেননা, প্রতিদিন বাঘ এসেছে বাঘ এসেছে বলে যে রাখাল বালকের গল্পের মতোই সত্যিকার বাঘ যখন অজগর হয়ে নিজেদের ঘরে ঢুকে সব একেবারে তছ-নছ করে দেয়ার আগেই এখনি সময় ঐ সব ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে শক্ত হাতে রুখে দেয়া। এ শিল্প ধ্বংসের সাথে যে বা যারা জড়িত, এক্ষুনি তাদের কঠোর হস্তে দমন করা উচিৎ , সে যত বড় শক্তিশালীই হউক। কেননা রাষ্ট্র ও জনগণের মিলিত শক্তির কাছে সেই পেছনের ও অন্ধকারের শক্তি পালানোরও পথ খুঁজে পাবেনা। আমরা কি পারবো এ যুদ্ধে জয়ী হতে ? আমাদেরকে যে পারতেই হবে।

Salim932@googlemail.com
২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৩, লন্ডন .

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *