যে কারণে প্রবাসীরা নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারবে না?

যে কারণে প্রবাসীরা নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারবে না?

সৈয়দ শাহ সেলিম আহমেদ : 

আপডেট:০১:০০, ফেব্রুয়ারি ২৭ , ২০১৬

 

ব্রিটেন, আমেরিকা, মধ্যপ্রাচ্য কিংবা বিশ্বের নানা প্রান্তের হাজারো বাঙালি মাত্রই জানেন, তাদের অক্লান্ত পরিশ্রম, দেন-দরবার, লিয়াজো আর তুমুল আন্দোলনের ফলে মহাজোট সরকারের নেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অবশেষে প্রবাসীদের ভোটাধিকারের ঘোষণা দিয়েছেন। দীর্ঘদিন ধরে বহু নেতা নেত্রী, মন্ত্রী আমলা আর সরকার প্রধানদের (গণতান্ত্রিক-অগণতান্ত্রিক) সাথে প্রবাসীরা আবদার ও দাবী দাওয়া দিয়ে আসছিলেন।যাতে তাদের স্বদেশে ভোটের অধিকার দেয়া হয়। ব্রিটেন বসবাসের কারণে ব্রিটেন প্রবাসীদের আন্দোলন সংগ্রামের প্রত্যক্ষ স্বাক্ষী হেতু দেখেছি এর ক্রিয়া প্রতিক্রিয়া। অনেক মন্ত্রী, আমলা, সরকার প্রধান প্রবাসীদের বার বার আশ্বাস দিয়েছিলেন, নানান আইনি জটিলতার ব্যাখ্যা ও সুরাহার পর ভোটের অধিকার দেয়ার ঘোষণা বার বার দিয়েছিলেন। কিন্তু বাস্তবায়নের কোন লক্ষণ কখনো দৃশ্যমান ছিলোনা। বর্তমান সরকার অবশেষে সুস্পষ্ট দিক নির্দেশনা সহকারে এর বাস্তবায়নের তাগিদ ও উদ্যোগের কথা নিশ্চিত করেছিলেন।শেখ হাসিনার সরকারের এই উদ্যোগ নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। সেজন্যে প্রবাসী আন্দোলনকারী নেতৃবৃন্দ সহ সকলেই সাধুবাদ জ্ঞাপনের সাথে সাথে আনন্দিত হয়েছিলেন।কোথাও কোথাও সেদিন মিষ্টি বিতরন করতে দেখেছিলাম।এই পর্যন্তই চলছিলো বেশ ভালোভাবেই। কিন্তু গত দুই সপ্তাহ আগে ঢাকা সফরকালে বর্তমান সরকারের মন্ত্রী পরিষদে গৃহীত সিদ্ধান্তের কথা শুনে স্তম্ভিত ও হতবাক হয়েছিলাম। অনেকের সাথে কথাও বলেছিলাম। সরকারের ভিতর মহলে আলাপ আলোচনা করে যা জানতে পেরেছি- আজকের লেখায় সেটাই তুলে ধরার চেষ্টা করছি।

মন্ত্রীপরিষদের সভায় পাশ হওয়া দ্বৈত নাগরিকত্ব আইন সংক্রান্ত বিষয়ে বেশ কিছু মন্ত্রীর সাথে কথা হয়।বুঝলাম এই গৃহীত সিদ্ধান্তের বিষয়ে অনেক মন্ত্রীর সুস্পষ্ট কোন ধারণাই নেই। দুইজন মন্ত্রী মন্ত্রীপরিষদের মিটিং এ উপস্থিত থাকা সত্যেও বলতেই পারলেননা আদৌ এই আইন সভায় পাশ হয়েছে কিনা কিংবা উত্থাপিত হয়েছে কিনা। যখন বললাম খোদ মন্ত্রী পরিষদ সচিব ব্রিফ করেছেন এ বিষয়ে- তখনি উনারা নিশ্চিত হলেন। তবে একজন বয়োজ্যেষ্ট মন্ত্রী বিনয়ের সাথে বললেন, মনে হলো প্রধানমন্ত্রী নোটস ভালোভাবে লক্ষ্য না করেই আমলাদের কথায় ফাইলে সই করেছেন। নাহলে খোদ প্রধানমন্ত্রী নিজেই যেখানে প্রবাসীদের ভোটাধিকার দিলেন, আবার একইভাবে তিনি কেন প্রবাসীদের নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার ক্ষেত্রে আইনি বাধা তৈরি করবেন ? তিনি আরেকটু বাড়িয়ে বললেন, মজার ব্যাপার হলো মন্ত্রী পরিষদের অনেক সদস্যই দ্বৈত নাগরিক, আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক ও মন্ত্রী আশারাফুল ইসলাম নিজেও দ্বৈত নাগরিক, সজীব ওয়াজেদ সহ অনেকেই দ্বৈত নাগরিক।প্রস্তাবিত আইন গেজেট আকারে প্রকাশের পর মন্ত্রী পরিষদের অনেকেই নতুন নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারবেননা- জেনে শুনে সবাই এ আইন পরিষদের সভায় আলোচনা ছাড়াই কিভাবে পাশ করে দিলেন? বয়োজ্যেষ্ট মন্ত্রী নিজেই আক্ষেপ করে বললেন।

কি আছে নতুন আইনে-

সভায় পাশ করা আইনে বলা হয়েছে, দ্বৈত নাগরিক বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা যারা প্রবাসী বাংলাদেশ ও ঐসব দেশের নাগরিক তারা জাতীয় নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারবেননা।

মন্ত্রী পরিষদে পাশ করা আইন সাধারণতঃ সংসদে উত্থাপনের দরকার পড়েনা, বরং গেজেটের মাধ্যমে সেটা বাস্তবায়নের বিধান রয়েছে।

যে তথ্য হ্নদয়ে আঘাত করে-

এক ধরনের সরকারি কর্মকর্তা আছেন, যারা কিছুতেই মানতে রাজী নন বা কষ্টবোধ করেন প্রবাসীরা হঠাত করে দেশে গিয়ে নির্বাচনে প্রার্থী হয়ে জনপ্রতিনিধি হয়ে যান। এতে তাদের আত্মমর্যাদা ও অভিজাত্যে ঘা যেমন লাগে, সেই সাথে রিটায়ার্ডের পর তাদের স্থান প্রবাসীদের দ্বারা দখলে যাওয়ার সম্ভাবনা প্রবল হওয়াতে তারা বেশ নাখোশ। তাই অনেক হেকমতের মাধ্যমে মন্ত্রীপরিষদের জন্য তারা নোটস তৈরি করে দ্বৈত নাগরিকত্ব আইন সংশোধনের ব্যবস্থা করেন, যা মন্ত্রী পরিষদে বিনা বাধায় পাশ হয়ে যায়, যেখানে খোদ প্রধানমন্ত্রীও সম্মতি দেন।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী-

বঙ্গবন্ধুর কন্যা হিসেবে অনেক সাহসী সিদ্ধান্তের জন্য ইতোমধ্যে আপনি দেশে বিদেশে ব্যাপক আলোচিত, সমালোচিত এবং সেই সাথে প্রশংসিতও। প্রবাসীদের দীর্ঘদিনের প্রাণের দাবী ভোটাধিকার প্রদানের মাধ্যমে আপনি দূরদর্শী এক রাষ্ট্রনায়কের পরিচয় দিয়েছেন। অথচ সেই বঙ্গবন্ধুর কন্যা একদিকে ভোটাধিকার দিলেন, অপরদিকে প্রবাসীদের নির্বাচনে প্রার্থী হয়ে জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হয়ে দেশের জনগণের কল্যাণে কাজ করার পথ রুদ্ধ করে দিলেন ? একজন মা তার সন্তানদের জন্য উপযুক্ত আলো বাতাসের সুন্দর ব্যবস্থা করে দিয়ে আবার সেই আলোবাতাস আগমন- নির্গমনের পথতো বন্ধ করতে পারেননা।তাই কেন জানি মনে হয়, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে দ্বৈত নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন সঠিকভাবে উপস্থাপন ও ব্রীফ না করেই যেন তেন ভাবে জোড়া তালি দিয়ে মন্ত্রী পরিষদে উত্থাপনের মাধ্যমে অনায়াসেই সেই কর্মকর্তারাই পাশ করিয়ে নিয়েছেন। যদি তাই হয়, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আপনার নিজস্ব চ্যানেলে সেই সারসংক্ষেপ যাতে আবারো আপনার টেবিলে উপস্থাপন করা হয়- যাতে আপনি নিজে পর্যালোচনা করতে পারেন, সেই ব্যবস্থা করুন।কেননা একবার গেজেট হয়ে গেলে এই আমলাতন্ত্র সেই গেজেট বাতিল করতে শতাব্দীর পর শতাব্দি পার করে দিবে।

আর প্রিয় প্রবাসী ভাই বোনেরা,

আপনারাও সোচ্চার হউন- যে আইন সংশোধনী মন্ত্রী পরিষদে পাশ করা হয়েছে সম্প্রতি, সেই আইন যাতে গেজেট আকারে প্রকাশিত না হয়, সেজন্য সব লবীতে জোরালো আন্দোলন শুরু করুন। কেননা, প্রবাসীরা আন্দোলন ছাড়া কোন কিছুই এখনো অর্জন করতে পারেননি। সোচ্চার হতে হবে এখনি। কয়েক শতাব্দীর আন্দোলনের ফসল ভোটাধিকার প্রাপ্তি। আর যদি নির্বাচনে প্রার্থী হতে না পারেন, তাহলে সেই ভোটাধিকার অর্জন অর্থহীন হয়ে যাবে। দেশের জমি জামার জন্য তখন আইডি কার্ড অর্জনও সোনার হরিণ হয়ে যাবে।হিমালয় পর্বত সামনে দাঁড়ানোর আগে এখনি পথ পরিষ্কার করা জরুরী।

salim932@googlemail.com

26th Feb 2016, London

Posted in মতামত

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *