হঠাৎ অস্থিরতা- থানায় এলএমজি স্থাপন, ধরাশায়ী হেফাজত, ইন্ডিয়ার সেনা প্রধান ও জনকেরির একই সাথে ঢাকা সফর

হঠাৎ অস্থিরতা- থানায় এলএমজি স্থাপন, ধরাশায়ী হেফাজত, ইন্ডিয়ার সেনা প্রধান ও জনকেরির একই সাথে ঢাকা সফর

রাজনৈতিক কৌশলী খেলায় হেফাজত দ্বিতীয়বারের মতো ধরা খেয়ে বলা যায় চুপসে গেছে। শাপলা চত্বরে বিরোধীদের চরম বৈপিরিত্ব অবস্থানের কারণে অসহায়ভাবে ধরাশায়ী হয়ে বিদায় নিয়েও হেফাজতের রাজনৈতিক কৌশল শেখা হয়নি। রাজনীতি করতে হলে শুধু ধর্মীয় জিগির তুলে জোয়ার তোলা গেলেও ফায়দা ঘরে তোলা যায়না-হেফাজত এখনও সেই রাজনীতির কৌশলী খেলার কাছে শিশুর মতো আচরণ, অসহায়ভাবে রাজনীতির মাঠ থেকে সব কটা ষ্টেক হোল্ডারদের সাথে যোগাযোগ সত্যেও সরকারের কৌশলী খেলায় ফের অসহায় ভাবে মুখ থুবরে পরা ছাড়া উপায় ছিলনা। প্রয়াত মালেক উকিল বেশ চমৎকারভাবে এই কৌশলী খেলাকে মুন্সীয়ানাভাবে স্বীকৃতি দিয়ে গেছেন রাজনীতি বিজ্ঞানে । এখানে নীতি নৈতিকতার প্রশ্ন উত্থাপিত হলে অবশ্য ভিন্ন ব্যাখ্যা চলে আসে। তবে এই আলোচনা কেবল রাজনীতির কৌশলী খেলার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখতে চাই।

অন্য অর্থে যদি বলি, আগামী ২০-২৫ বছর পরে বাংলাদেশে আফগানিস্তানের মতো অবস্থা তৈরি করে মার্কিনীদের নেতৃত্বে বহুজাতিক বাহিনী কিংবা ভারতীয় বোমারু বিমান থেকে বি-৫২ বা ফাইটার জেট থেকে বোমা ফেলে আমার অসহায় নিরীহ জনসাধারণকে হত্যা করা হউক এমন ক্ষেত্রে বা এমন রাজনীতি বাংলাদেশের জন্য কল্যাণকর নয়।

০২) হেফাজতের সাথে সরকারের কৌশলী রাজনৈতিক চালের বিপরীতে হঠাত করে বাংলাদেশের প্রশাসন ও সরকারের মধ্যে এক ধরনের অস্থিরতা চরম পর্যায়ে প্রকাশিত হয়ে যায়। ঠিক সেই সময়, যখন কোন প্রকারের কূটনীতির মারপ্যাচ বা সরকারি প্রচার প্রচারণা ছাড়া ( অন্য শব্দ হলো শুধু মাত্র টেলিফোনের উপর ভর করেই) ভারতের সেনা প্রধান বাংলাদেশ সেনা প্রধানের আমন্ত্রণে ঢাকায় পৌছেন (এই লেখা পর্যন্ত, আরও কিছুদিন তিনি ঢাকায় অবস্থান করবেন, তখন হয়ত আরও বৈঠক হতে পারে অনেকের সাথে)। এ ধরনের সফর হতেই পারে দুই বাহিনীর মধ্যে সৌজন্য সফরের রেওয়াজ রয়েছে বিশ্বের দেশে দেশে।   ভারতের সেনা প্রধান যখন ঢাকায় ঠিক তখনি জন কেরি ভারত হয়ে ঢাকায় ঝটিকা সফরে আসেন। আবার নয়া দিল্লী হয়েই তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ফিরে যাবেন। এই পর্যন্তই খবর মার্কিন দূতাবাস সূত্রেই জানানো হয়েছে। এই দুই হেভী ওয়েটের ঢাকা সফরের প্রাক্কালেই সরকারের সব চাইতে লজিস্টিক বাহিনীর নিজেদের নিরাপত্তার ইস্যুতে ( যেখানে জনগনের জান মালের নিরাপত্তা দেয়ার কথা, সেখানে তাদেরই নিরাপত্তা দরকার ) থানায় সেনাবাহিনীর ভারি অস্র সস্র স্থাপনের সচিত্র ছবি সংবাদ মাধ্যম সমূহে ফলাও করে প্রচারিত হচ্ছে। অথচ দেশে যুদ্ধপরিস্থিত কিংবা বহিঃশত্রুর( কিংবা আকাশ পথে আক্রমণের) আক্রমণের মতো কোন পরিস্থিতি এখন পর্যন্ত বিরাজমান নয়। তারপরেও এলএমজি এবং বাংকার স্থাপন জনমনে নানা প্রশ্ন এখন উকি ঝুকি মারছে। বিভিন্ন সন্ত্রাসি গোষ্ঠী বরং আস্কারা পেয়ে যাবে তাতে। তার চেয়ে ভাল হতো ভ্যানে বা ট্র্যাকে করে যদি মেশিনিগান নিয়ে কোন ঝটলার সামনে দিয়ে পুলিশ ট্র্যাক যেত সেটাই বেশী ইফেক্টিভ হত। সন্ত্রাসিরা গা ঢাকা দিত। এখনতো দেশে এক ধরনের অস্থিতিশীলতা তৈরি হতে পারে। অনেক থানার পুলিশ এলএমজি বাংকার স্থাপনে মনোবল ভেঙ্গে থানার বাইরে অপারেশনে যেতে ইতস্থত করবে। দলীয় রাজনৈতিক (সত্যিকারে রাজনীতিবিদ) নেতাদের মধ্যে ভয় কাজ করবে সন্দেহ নাই। কার এমন দুর্বল পরামর্শে থানায় এলএমজি বাংকার স্থাপন করা হলো। সরকারের ভঙ্গুর অবস্থাকে এমন খোলাশা বিশ্বের কাছে কারা করল?

এই ম্যাকানিজম একবার স্থাপন করে ফের উঠিয়ে নেয়াও হবে বিপদজনক। এমন ভুল কৌশলী পরামর্শ সরকারকে যে বা যারা দিয়ে কার্য সিদ্ধি করেছে তারা অবশ্যই সরকারের ভাল চায়নি। কারণ হঠাত করে পুলিশ এবং সেনাবাহিনীর মধ্যে একটা মনস্থাত্বিক দ্বন্ধ এমনভাবে তৈরি করা হল-যা সরকারের জন্য সুখকর নয়। সরকারের লজিস্টিক বাহিনী হিসেবে পুলিশ বিজিবি সেনা নৌ আনসার সবাই নিয়োজিত। এমতাবস্থায় এমন যুদ্ধপরিস্থিতির ভারি অস্র পুলিশকে দিয়ে সব বাহিনীর মধ্যে দূরত্ব তৈরির ক্ষেত্র কারা করছে, সরকারকে ভেবে দেখতে হবে।

০৩) দক্ষিণ বঙ্গোপসাগরে চীনের দুটি ফ্রিগেট নিয়ে এমনিতেই ভারত-মার্কিনীদের সাথে ঢাকার এক ধরনের শীতল-গরম সম্পর্ক চলতেছে। চায়নার একচেটিয়া ঢাকার বাজারে নয়াদিল্লি ও ওয়াশিংটন ভাগ বসাতে ব্যস্ত। নরেন্দ্র মোদীর ঢাকা সফরের পর পরই ভারতের সেনাপ্রধান ও কেরির ঢাকা সফর সেই বার্তাই দেয়। যদিও সফরের আড়ালে বন্ধুত্ব ও সৌহাদ্রের নতুন দিগন্তের কথাই বার বার বলা হচ্ছে। কিন্তু ঘুরে ফিরে চীনের দেয়া দুটি ফ্রিগেট ভারত-মার্কিনীদের অন্তর ভেদ করে দিয়েছে, যা নিয়ে তারা এখন দক্ষিণ চীন সাগরে নিজেদের আধিপত্য নিয়েই ব্যস্ত। বাংলাদেশ একই সাথে চীনের রোড এন্ড বেল্ট নীতি আর ইন্দো-মার্কিন এই দুই আলোচনায় সমানভাবে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। ঢাকার উদ্দেশ্য মহৎ- ভারসাম্যের কূটনীতি। নয়াদিল্লি ও ওয়াশিংটন চায় একনীতি, চায়না চায় ঢাকা থাকুক তাদের সাথে। এমনি এক নাতিশীতোষ্ণ পরিস্থিতিতে হেফাজতকে ঢাকা নয়াদিল্লি ও ওয়াশিংটনের উত্থাল এক খেলায় আপাততঃ হেফাজত ধরাশায়ী হয়ে মাঠ থেকে বিদায় নিলেও হঠাত করে থানায় এলএমজি বাংকার নতুন করে পরিস্থিতিকে ভিন্ন  এক মাত্রায় নিয়ে যাচ্ছে। হতে পারে এটা এক ধরনের নতুন এক প্রচারের কৌশল। এক খেলাকে চাপা দিতে আরেক কৌশলী খেলা।

 

সৈয়দ শাহ সেলিম আহমেদ

১০ এপ্রিল ২০২১, লন্ডন

1 Comment

Comments are closed