গৌরবের ৪০ বছরঃলোক প্রশাসন বিভাগ-ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

গৌরবের ৪০ বছরঃলোক প্রশাসন বিভাগ-ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

গৌরবের ৪০ বছরঃলোক প্রশাসন বিভাগ-ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

Submitted by syed shah salim… on Wed, 05/06/2013 – 10:37pm

হাটি হাটি পা পা করে একেবারে ৪০টি বছর পার করে দেয়া, চাট্রিখানি কথা নয়। এই ৪০ বছরে রয়েছে আমাদের নানা অর্জন, বিচিত্র স্মৃতি, বহু রঙ্গিন ভালোবাসা, নানা তিক্ত অভিজ্ঞতা। আর এতোসব মিলিয়েইতো আমাদের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের ৪০ বছরের পূর্তি উৎসবের এই আয়োজন-১৫ ও ১৬ জুন ২০১৩ এই বিভাগের চল্লিশ বছর পূর্তি উৎসব, যা শুনে দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা এই লোক প্রশাসন পরিবারের শত-হাজারো গ্র্যাজুয়েট, পোস্টগ্রাজুয়েট, ছাত্র-ছাত্রী, শিক্ষক-শিক্ষিকাবৃন্দের মধ্যে দেখা দিয়েছে এক প্রাণ চঞ্চল আকুলতা। নানা সামাজিক সেতু বন্ধনের সাইট আর মোবাইল প্রযুক্তির এই যুগে সেই বন্ধনকে করে তুলেছে আরো মজবুত ও ঐকান্তিক ব্যাকুলতার এক নব মাত্রিকে।

publicadmin35.jpgবাংলাদেশের স্বাধীনতার অব্যাহতি পরে টাল-মাটাল রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক অবস্থার প্রেক্ষিতে তৎকালীন খ্যাতিমান অধ্যাপক নূর মোহাম্মদ মিঞার অক্লান্ত পরিশ্রম আর একনিষ্ঠ সাধনার ফলে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ থেকে পাবলিক এডমিনিস্ট্রেশন-কে সম্পূর্ণ আলাদা করে এক স্বতন্ত্র ও যুগোপযোগী প্রশাসনিক ও উন্নয়ন কর্মকর্তা ও গবেষক একইসাথে দক্ষ ও বিচক্ষণ কর্মী বাহিনী সৃষ্টির লক্ষ্য নিয়ে লোকপ্রশাসন বিভাগের যাত্রা শুরু করেন, যা আজকে উন্নয়ন প্রশাসন ও কম্পিউটার বিজ্ঞানের সাথে সামঞ্জস্য রেখে নতুন নতুন অর্গানাইজেশন, প্রশাসনিক উন্নয়নের আধুনিক মডেল তৈরিতে বিরামহীন এক চেষ্টা পরিলক্ষিত হচ্ছে।

এই ৪০ বছরে পাবলিক এডমিনিস্ট্রেশন ডিপার্টম্যান্টের রয়েছে নানা বর্ণাঢ্য অর্জন এবং দেশ মাতৃকার জন্য উন্নয়ন-প্রশাসনে ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ও মানব উন্নয়নে নানা গবেষণা ধর্মী তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ ও বিনিময়, উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়ন, বাস্তবায়নের সুপারিশমালা সহ আমাদের রাজনৈতিক, প্রশাসনিক ও নির্বাচনী আচরণবিধি সংস্কার, আধুনিকায়ন, বিশ্ববিদ্যালয় সমূহের উন্নয়ন সহ সকল ক্ষেত্রেই এই বিভাগের গ্র্যাজুয়েট, পোস্টগ্রাজুয়েট, গবেষক, শিক্ষক-শিক্ষিকাবৃন্দের রয়েছে নানা খ্যাতি, সুখ্যাতি।কিন্তু এতো সব অর্জনে পাবলিক এডমিনিস্ট্রেশন ডিপার্টম্যান্টের পথ ছিলোনা কণ্টকাকীর্ণ। অনেক ঘাত-প্রতিঘাত আর উত্থান-পতনের মধ্য দিয়েই আজকের এই অবস্থানে এসেছে এই ডিপার্টম্যান্ট।

publicadmin28.jpg৪০ বছরের এই দীর্ঘ এ পথ যাত্রায় আমরা হারিয়েছি আমাদের অনেক নিবেদিত প্রাণ ছাত্র-ছাত্রী ও মহান শিক্ষক বৃন্দদের, যাদের অভাব আমরা আজকের এই ৪০ বছরের পূর্তি উৎসবের মুহূর্তে প্রতিনিয়ত অভাব অনুভব করছি। এই সময়ের মধ্যে আমরা এমন সব শিক্ষকদের হারিয়েছি, যারা বিভাগের এবং বিভাগের বাইরে বিশ্ববিদ্যালয় অঙ্গনের সকল ছাত্র-ছাত্রীদের কাছে ছিলেন অত্যন্ত আদর্শ এক শিক্ষক, একজন অভিভাবক, মাথার উপর ছায়া দেয়া বটগাছের ন্যায় এক বিরাট মহীরুহ। তাদেরই একজন প্রফেসর ডঃ মোহাম্মদ আসাদ-উজ্জ-জামান স্যার।আসাদ উজ্জ জামান স্যার একাধারে ছিলেন এই বিভাগের একজন প্রথিত যশা শিক্ষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জসীম উদ্দীন হলের খ্যাতিমান এবং সর্বাধিক জনপ্রিয় একজন হাউস টিউটর-ফলে বিভাগের ছাত্র-ছাত্রী সহ জসীম উদ্দীন হলের সংযুক্ত বিভিন্ন বিভাগের ছাত্র-ছাত্রীদের কাছে ছিলেন সমান শ্রদ্ধার আসনে অধিষ্ঠিত।মৃত্যুর আগে আসাদ স্যার বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ার হিসেবে সীমিত ক্ষমতা ও সাধ্যের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয় সমূহের পরিচালনা কাঠামো, রেজিস্ট্রেশন, মনিটরিং সহ নানা দিকের সংস্কার সাধনে ছিলেন তৎপর এবং বলা যায় তারই আমলে এই মঞ্জুরি কমিশন অত্যন্ত দক্ষতার সাথে ও সুচারুভাবে যথাযথ দায়িত্ব পালনের রেকর্ড অর্জন করে।

৪০ বছরের ব্যবধানে আমরা একে একে হারিয়েছি আমাদের প্রিয় শিক্ষক প্রফেসর মোফাজ্জালুল হককে।ইতিমধ্যে আমরা আমাদের কাছ থেকে অত্যন্ত দুঃখ ভারাক্রান্ত হ্রদয়ে চির বিদায় জানিয়েছি আমাদের এই বিভাগের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান, যাকে গুরু অব পাবলিক এডমিনিস্ট্রেশন হিসেবে দেখা হয়ে থাকে, সেই আপাদমস্তক অত্যন্ত শ্রদ্ধেয়, অত্যন্ত অমায়িক এক শিক্ষক প্রফেসর নূর মোহাম্মদ মিঞাকে।প্রফেসর মিঞা ছিলেন অত্যন্ত সৎ, বহুমাত্রিক প্রতিভার অধিকারি এক শিক্ষক-যিনি ছাত্র-ছাত্রীদের প্রচলিত আধুনিক শিক্ষার সাথে ইসলামের শ্বাসতঃ গুণাবলীর সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়ার সাথে আধ্যাত্মিক শিক্ষার এক নিবিড় অথচ সুন্দর সাযুজ্য প্রতিস্থাপন মন-মন-মগজে ও বাস্তব জীবনে চলার পথের নিশানা এতো সুচারুভাবে করে দিতেন, যা একজন ছাত্র-ছাত্রীকে প্রকৃত অর্থেই দক্ষ গ্র্যাজুয়েট হওয়ার সাথে সাথে বাস্তবের পৃথিবীর ও কঠিন চ্যালেঞ্জের মোকাবেলায় পারদর্শী ও দক্ষ করে গড়ে উঠতে সাহায্য করতো।মরহুম প্রফেসর মোফাজ্জালুল হক ছিলেন আরো অমায়িক ও জ্ঞান পিপাষু এক মহান শিক্ষক।জীবনে যিনি কখনো নিজ অধীনস্থ কর্মচারী, শিক্ষক, ছাত্র-ছাত্রী কাউকেই তুমি শব্দ বলে সম্বোধন করেছেন বলে শুনিনি। মোফাজ্জালুল হক স্যারের সাথে যখনি দেখা হতো, তখনি কি পাঠ্যক্রম, কি দেশীয় ও আন্তর্জাতিক প্রেক্ষিত নিয়ে সেমিনার-সিম্পোজিয়াম কিংবা টিচার্স ক্লাবের কোন আলোচনাতে অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে আপনি বলে সম্বোধন করতেন, যা তাকে করে তুলেছিলো আরো উদার ও আরো মহান এক শিক্ষকে।publicadmin24.jpg

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্রিকেট ক্লাবের সুখ্যাতি ও সুনামের সাথে এই বিভাগের নাম ব্যাপকভাবে জড়িত। কেননা, ক্রিকেটের সূচনা লগ্নে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্রিকেট টিমের সাথে এই বিভাগের দেশ সেরা ক্রিকেটাররা জড়িত ছিলেন, যারা পরবর্তীতে বাংলাদেশের জাতীয় টিমের জন্যেও ছিলেন অপরিহার্য খেলোয়াড়। তাদের অনেকেই এখনো বাংলাদেশের ক্রিকেট উন্নয়নে ব্যাপক ভূমিকা রেখে চলেছেন।সকলের নাম নিয়ে এই কলামের কলেবর বৃদ্ধি করতে চাইনা। তবে যাদের নাম না নিলেই নয়, তাদের মধ্যে অন্যতম হলেন এই বিভাগেরই কৃতি ছাত্র আতাহার আলী, মিনহাজুল আবেদীন নান্নু, ফারুক আহমেদ প্রমুখ।তবে এই আনন্দের মাজেও কিছু দুঃখের স্মৃতি আছে, এই বিভাগেরই খ্যাতিমান ক্রিকেটার, আমাদের প্রিয় বন্ধু মাসুদ আহমেদ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করার পরে নিজ বাসা থেকে খুব ভোরে জগিং করতে গিয়ে আর ফিরে আসেনি। জলজন্তু একজন খ্যাতিমান ক্রিকেট প্লেয়ার এইভাবে হারিয়ে গেলো-অথচ আমাদের সরকার প্রশাসন, পুলিশ আজও কোন কূল-কিনারাই করতে পারলোনা। মাসুদের গোটা পরিবার ২১ বছর ধরে মাসুদকে হন্যে হয়ে খুঁজে ফিরছেন।আমার কলিজার সবটুকু দরদ দিয়ে এখনো আশা করি মাসুদ আমাদের মাজে ফিরে আসবেই একদিন।

আমাদের প্রিয় শিক্ষকদের মতোই আমরা হারিয়েছি আমাদের এই বিভাগের আরো অনেক সহপাঠী, বন্ধু, শুভানুধ্যায়ীদের। যেমন করে আমরা হারিয়েছি বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনীর গর্বিত অফিসার, আমাদের বন্ধু রুহুল আমীনকে, যে অনেকটা নিজের খাম-খেয়ালি পনায় শরীরে কখন যে ক্যানসারের মতো বিষাক্ত এক রোগকে বাসা বাধতে দেয়, যা ছিলো সকলের অজানা। বড় অল্প বয়সে বন্ধু রুহুল আমীন আমাদের ছেড়ে চলে যায়।মাত্র কিছুদিন আগে আমরা হারালাম আমাদের এই বিভাগের আরো তিন, তিন- জন বন্ধুকে। তাদের মধ্যে রয়েছেন, রাজধানী ঢাকার এক বেসরকারি ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের খ্যাতিমান শিক্ষয়িত্রী কাজী সালমা বিনতে বন্ধু সীমা, ঢাকার এক গার্মেন্টসে চাকুরীরত আমাদের আরো এক তরুণ বন্ধু, সকলের প্রিয় প্রসন্ন কুমার কানু, একজন দক্ষ ও অত্যন্ত মেধাবী সফল উদীয়মান এক মানেজম্যান্ট প্রফেশনাল বন্ধু এলেন বাড়ৈ, যাদের সকলের অকস্মাৎ হার্ট এটাকে মৃত্যু ঘটেছে। এই তিন জনই প্রায় সমসাময়িক, একই সেশনের ছাত্র, একই সাথে পাশ করে বেরিয়েছিলেন। নিয়তির কি নিষ্ঠুর পরিহাস আমাদের এই তিন বন্ধুই হার্ট ফেইল্যুর হয়ে আমাদের ছেড়ে পরপারে চিরদিনের জব্য চলে গিয়েছেন।আমরা তাদের সকলের আত্মার মাগফেরাত কামনা করছি।সকলের নাম হয়তো সময়াভাবে সংগ্রহ করে পাঠকদের উদ্দেশ্যে উপস্থাপন করতে সম্ভব হচ্ছেনা। এই অনিচ্ছাকৃত অপারগতার জন্যে আন্তরিকভাবে দুঃখিত ও ক্ষমাপ্রার্থী।তবে কোন পাঠক, বন্ধু, শুভাকাংখী যদি এই ব্যাপারে তথ্য প্রদান করেন, তবে অবশ্যই তা আগামী কলেবরে যথাযথভাবে সংরক্ষিত ও প্রকাশের ব্যবস্থা করা হবে।

publicadmin1.jpgগৌরবের এই ৪০ বছর পূর্তিতে আজ মনে পড়ছে, অনেক ঘটনা, অনেক সুন্দর স্মৃতির কথা।সকল স্মৃতিতো একসাথে পাঠকদের উদ্দেশ্যে উপস্থাপন করা সম্ভব নয়, সঙ্গতও হবেনা। তবে যে কথা না বললেই নয়, বিগত ২০ বছর পূর্তি উৎসব পালন ছিলো আমাদের কাছে অসম্ভব এক আনন্দের ও স্মৃতিময় এক মধুর ঘটনা। যার সিংহ ভাগই প্রাপ্য আজকের অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী শিক্ষক, এই বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান ডঃ হাবিব মোহাম্মদ জাফর উল্লাহ। প্রফেসর জাফর স্যারের অক্লান্ত পরিশ্রমের আর সার্থক বাস্তবায়নের সেই বিশ বছরের জয়ন্তী উৎসবের সুন্দর এক অসাধারণ আয়োজনের বাস্তব নামই হচ্ছে( আমার দৃষ্টিতে) আজকের ৪০ বছরের এই পূর্তি উৎসব।

publicadmin18.jpg১৯৮৯ সালের বিভাগের সার্ক শিক্ষা সফর নিয়ে নানা তিক্ত অভিজ্ঞতা আর এক শ্রেণীর পত্রিকার অতিরঞ্জিত খবর প্রকাশের ফলে, সার্ক শিক্ষা সফরে বিশ্ববিদ্যালয় এবং সিন্ডিকেট বেশ বাধা হয়ে দাঁড়ায়। মরহুম প্রফেসর আসাদ স্যার, লোকপ্রশাসন বিভাগের গর্ব ও অহংকারের ( এই শব্দ আমি এখানে কেন ব্যবহার করলাম- তা একটু পরেই পাঠক জানতে পারবেন প্লিজ) প্রতীক সকল ছাত্র-ছাত্রীদের কাছে বেশ কঠিন এবং কাট-খোট্টা( সততা ও আদর্শ এবং ষ্ট্রেইট ফরোয়ার্ডের জন্য) হিসেবে খ্যাত ডঃ মোহাম্মদ মহব্বত খান, অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী আমাদের আরো এক প্রিয় শিক্ষক ডঃ মোহাম্মদ কামরুল আলমের প্রচেষ্টার ফলে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সার্ক শিক্ষা সফর চালু রাখতে সম্মত হন। ফলশ্রুতিতে আমাদের সেশনের শেষ বর্ষে এসে এই কাঙ্ক্ষিত ও বহু প্রতীক্ষিত শিক্ষা সফর সম্পন্ন হতে পেরেছিলো। সার্কের এই শিক্ষা সফরটি ছিলো আমাদের জন্য একদিকে যেমন শিক্ষণীয়, একই সাথে ছিলো বিভাগের হ্রত গৌরব পূণঃপ্রতিষ্টার জন্য অসম্ভব এক মর্যাদার ও মিলিয়ন ডলারের প্রশ্নের উত্তরের ইগো। বলা বাহুল্য আমরা যে তা অত্যন্ত দক্ষতার সাথে পেরেছিলাম, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সকল নীতিমালা পূরণে ও বিগত দিনের অনাকাঙ্ক্ষিত সংবাদের বা অপবাদের মুখে আমরা অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে দেশবাসী ও সকলের কাছে সুন্দর এক দৃষ্টান্ত স্থাপনে সক্ষম হয়েছিলাম। আজকের এই সুবাধে আমাদের সকল বন্ধু ও সফর সঙ্গী সাথীদের সহ বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন, একই সাথে আমাদের সফর সঙ্গী প্রফেসর ডঃ জেরিনা রহমান খান, প্রফেসর ডঃ মোহাম্মদ মোহাব্বত খান, ডঃ কামরুল আলম, প্রফেসর মাহবুবুর রহমান সকলকে জানাই আন্তরিক অভিনন্দন ও ধন্যবাদ।কেননা সকলের আন্তরিক পরিশ্রম ও সহযোগিতা ছাড়া সেদিনকার ঐ সফর কিছুতেই সাফল্য মণ্ডিত হতোনা। আমরা যখন ভারতের রাজস্থান বিশ্ববিদ্যালয়ে সফর করি, ভারতের বিখ্যাত প্রফেসর ডঃ আর কে আরোরা এবং ভিসি ডঃ আর পি শর্মা(যাদের অসংখ্য রেফারেন্স পড়ানো হয়ে থাকে)সহ ছাত্র-ছাত্রীদের মাজে মিলিত হই, তখন আমরা দেখেছিলাম, অবাক বিস্ময়ে অবলোকন করেছিলাম, আমাদের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই কাট-খোট্টা বলে খ্যাত ডঃ মোহাম্মদ মোহাব্বত খানের খ্যাতি আর পাবলিক এডমিনিস্ট্রেশনের ক্ষেত্রে স্যারের অবদান ও ভূমিকায়, যা আমাদের অনেকের কাছে তখনো ছিলো অজানা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক,যিনি অত্যন্ত সাদা-মাঠা ভাবে জীবন যাপন করেন, দেশের গণ্ডি ছড়িয়ে বিদেশের মাটিতে ডঃ মোহাব্বত খানের প্রশংসায় আমরা সেদিন অভিভূত হয়েছিলাম। যার রেফারেন্স আমরা পড়ি বা পড়ানো হয়, সেই ডঃ শর্মা ও ডঃ আরোরা যখন বলছিলেন- আমাদের বিরল সৌভাগ্য আমরা মোহাব্বত খানের মতো একজন অসম্ভব এক গুনি শিক্ষকের কাছ থেকে শিক্ষা নিয়েছি।তাদের কাছ থেকে এই প্রথম অবগত হলাম পাবলিক এডমিনিস্ট্রেশনের জন্য আন্তর্জাতিকভাবে আমাদের এই মোহাব্বত খান স্যার কতো জনপ্রিয় এবং বলা যায় অসম্ভব এক এসেট, যা আমদের জন্য বিরাট এক গৌরবের।publicadmin12.jpg

এই লেখা যখন শেষ করতে যাবো, ঠিক তখনি যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা থেকে আমার বন্ধু, সহপাঠী আনিসের ফোন, যে জানালো অপর প্রান্তে (থ্রি-ওয়ে)আরো এক বন্ধু, সহপাঠী খালেদ লাইনে রয়েছে। তাদের সাথে আলাপে যখন জানালাম ডিপার্টম্যান্ট-এর উপর একটা লেখা তৈরি করছি, তখনি আমার এই দুই বন্ধু অনুরোধ করলো, লেখাতে কিছুতেই যেন অভিজিতকে ভুলে না যাই।আমি একটু অবাক এবং হতবিহবল হয়ে পড়ি, অভিজিতের কথা বলতেই আমার স্মৃতি চলে যায় ফেলে আসা সেই ২৩/২৪ বছর আগেকার বিশ্ববিদ্যালয়ের স্মৃতিতে। আমরা তখন প্রথম বর্ষ অনার্সের ছাত্র।সবে মাত্র পরিচয় মামুন, ক্যাডেট মামুন, নূরু,জিন্নাহ, খালেদ, রাশেদ, অভিজিত, মাহমুদ, এলেন, লুনা, কনা, মিথু, লিপি, দীপিকা,শিলা,তুলতুল,শিউলী,গৌতম, জুয়েল।তখনো বন্ধুত্বের সার্কেল বড় হয়নি। তখন ক্লাস নিতেন ডঃ নাজমুন নেসা মাহতাব, প্রফেসর জিন্নাহ, ডঃ মোহাম্মদ আলী হায়দার , ডঃ লুতফুল হক চৌধুরী, ডঃ গিয়াস উদ্দীন চৌধুরী। আমরা লক্ষ্য করলাম আমাদের মধ্যে অভিজিত অসম্ভব এক মেধাবী ছাত্র। টিচারদের ক্লাসে জট-পট যে প্রায় সব প্রশ্নের উত্তর দিয়ে দিতো।ক্লাসের বাইরে সেমিনার ও কমনরুমে আরো লক্ষ্য করলাম, অভিজিত অত্যন্ত নিপুণতার সাথে ক্লাস নোট যা নিয়েছিলো, বিভিন্ন রেফারেন্স সহকারে বন্ধুদের মাজে নিখুঁতভাবে উপস্থাপন করতো।কেন জানি একটু খটকা লাগতো, ছোট-খাট গড়নের, হাল্কা-পাতলা, মুখে মোটা গোফের এই ছেলেটির মাজে কোথায় যেন অলৌকিক এক মেধাবী শক্তি কাজ করছিলো, আমরা সকলেই তখন বুঝে নিয়েছিলাম এই ছেলেটি সাইন করবেই। কিন্তু আফসোস, মাত্র তিন মাস সময়ের ক্লাসের মাথায়, হঠাৎ করে অভিজিৎ উধাও, ক্লাসে আসা-যাওয়া একেবারে বন্ধ।খোজ নিয়ে যা জানতে পারলাম, তা ছিলো অত্যন্ত ভয়ংকর এবং রীতিমতো গা-শিউড়ে উঠার মতো। অভিজিতের পরিবারের সাথে আমাদের আগে থেকে কোন জানা-শুনা ছিলোনা, এলেন, বাড়ৈ, লিটন এদের সুবাধে একটু-আধটু জানাজানি।এলেন জানালো অভিজিত পাগল হয়ে গেছে, লেখা-পড়া সেজন্যেই বন্ধ। আমার কেন জানি বিশ্বাস হচ্ছিলনা। কোথায় যেন একটু গলত রয়ে গেছে মনে হচ্ছিলো, অভিজিতের কাছের বন্ধুরাও এড়িয়ে গেলো-তাই আর এগোয়নি। ডিপার্টম্যান্টে আমি অবগত করি, আশা এই কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী এই ছাত্রটির প্রতি হয়তো প্রশাসন যত্ন নিয়ে খোজ-খবর করবে, বড় ধরনের মানসিক অসুস্থতায় হয়তো কোন সুচিকিৎসার ব্যবস্থা নিতে পারে বিশ্ববিদ্যালয়। সময়ের ব্যবধানে, বিশ্ববিদ্যালয়ের নানা স্মৃতিময় রঙ্গিন সুখ-স্বপ্নে অভিজিৎ নামের সেই অসম্ভব মেধাবী ছেলেটি হারিয়ে যায়। আর সেই যে হারিয়ে যাওয়া, আজো জানিনা অভিজিৎ কেমন আছে, কোথায় আছে। অভিজিতের কাছের কোন বন্ধু-বান্ধবীরাও কখনো ভুলেও আর সে সব জানতে চায়নি বা জানাতে চায়নি। বিশ্ববিদ্যালয়ও ভুল করেও তার মেধাবী সন্তানটির কোন খোজ নেয়নি। আমাদের দেশে এভাবেই কতো সুন্দর মেধাবী অভিজিতরাই অনাদরে, অবহেলায়, কখনো মানসিক রোগী হয়ে(বা চক্রান্তে সাজানো হয় পূর্ব শত্রুতার জের ধরে)স্মৃতির আড়ালে চলে যায়।কেউ তার খবর রাখেনা। প্রিয় অভিজিৎ , তুমি যেখানেই থাকো , ভালো থাকো বন্ধু।

Salim932@googlemail.com
01st June 2013.

8Comments

1
syed shah salim…
syed shah salim ahmed's picture
Wed, 17/07/2013 – 11:26pm

রকীব এবং মাহবুব- তোমাদের অনেক ধন্যবাদ। ধন্যবাদ প্রিয় ব্লগ, ফেইস বুক আর পাবলিক এডমিন এলামনি, যাদের ফলশ্রুতি স্বরূপ হারিয়ে যাওয়া বন্ধুকে খোজে পাওয়া গেলো। এভাবে যদি এবং আমি বিশ্বাস করি, দৃঢ়তার সাথে বিশ্বাস করি, প্রিয় বন্ধু মাসুদ আহমেদও একদিন এমন করেই আমাদের মাজে ফিরে আসবে, সবাই মিলে দোয়া করো তাই যেন হয়। মাসুদের মা-বাবা, পরিবার মাসুদের জন্য কি পরিমাণ যে কান্না আর কষ্ট বুকে লালন করে মাসুদের ফিরে আসার প্রতীক্ষায় দিন গুনছেন, ৮ বছর আগে আমি যখন তাদের সাথে দেখা করতে যাই, তখন দেখেছিলাম, সে স্মৃতি আজো চোখের সামনে ভেসে উঠে। আহারে যদি এমন হতো রুহুল আমিন আবার না ফেরার দেশ থেকে ফিরে আসতো- মিরাক্যল কেমন হতো বন্ধুরা ? ভালো থেকো, অনেক ভালো।

ছবি ঃ আমাদের এলামনি রূমানা আপার সৌজন্যেঃ1297_batch11.jpg

  • Login to post comments
2
syed shah salim…
syed shah salim ahmed's picture
Tue, 02/07/2013 – 5:25am

kona lipi in 40yrs.jpg

  • Login to post comments
3
syed shah salim…
syed shah salim ahmed's picture
Mon, 17/06/2013 – 8:02pm

চল্লিশ বৎসর পূর্তি উৎসবের সেই র‍্যালী, ১৪ জুন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি চত্বর থেকে বের হয়, নবীন-প্রবীণের সেই মহা-মিলন মেলা, সাঙ্গ হয়েও হলোনা শেষ। যারা উপস্থিত হতে পেরেছিলেন, তারা সকলেই সৌভাগ্যবান, সকলকে আন্তরিক অভিনন্দন40yrs.jpg

  • Login to post comments
4
syed shah salim…
syed shah salim ahmed's picture
Sat, 15/06/2013 – 6:22pm

40yrs2.jpg

মাননীয় উপাচার্য অধ্যাপক আ আ ম আরেফীন সিদ্দিকী সহ পাবলিক এডমিনের চেয়ারম্যান ড মোসলেহ উদ্দীনকে কেক কেটে বিভাগীয় উৎসব শুভ সূচনা করতে দেখা যাচ্ছে।

  • Login to post comments
5
syed shah salim…
syed shah salim ahmed's picture
Fri, 14/06/2013 – 5:49pm

আমাদের সময়ে, অসম্ভব এক মেধাবী ছাত্র, বন্ধু ছিলেন, নাম তার খাদেম হোসেন। পাবলিক এডমিন এর উপর অজস্র রেফারেন্স সংগ্রহ করে নিজের বক্তব্য উপস্থাপনে ছিলো তার অশেষ দক্ষতা, খুব খাটা-খাটিও করতেন। বলা যায় রাত-দিন পড়া-শুনার মধ্যে লেগে থাকতেন এই খাদেম।বাড়ী মুন্সীগঞ্জে, আমাকে একবার সেখানে নিয়েও গিয়েছিলেন।শিক্ষক বাবার এই সন্তান, অধিক পড়া-লেখার কারণে কিনা জানিনা, ফাইনাল পরীক্ষার দিন পরীক্ষার হল থেকে খালি(সাদা) পেপার দিয়ে বের হয়ে গিয়েছিলেন।থাকতেন সুর্যসেন হলে। পরীক্ষার পর হলে খোজ করেও তাকে পাইনি।পর জেনেছিলাম, পরের বছর খাদেম পরীক্ষা দিয়ে পাশ করে বের হয়েছিলেন।আজকের পূণর্মিলনী উৎসবে প্রিয় সেই বন্ধু, সেই মেধাবী এলামনি কোথায় আছেন জানিনা, তবে খাদেমের সাফল্য কামনা করি।

  • Login to post comments
6
syed shah salim…
syed shah salim ahmed's picture
Tue, 11/06/2013 – 9:00pm

৪০ বছরের পূর্তি উৎসবের এই আমেজ এখন দেশের গন্ডি ছাড়িয়ে সারা বিশ্বের এক্স-পাবলিকএডদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ও উদ্দীপনা জাগিয়েছে। প্রতিদিন এখন ডোপান ফ্যামিলিতে নতুন নতুন ছবি পোষ্ট করা হচ্ছে। আমার বোন শ্রদ্ধেয় শীপা হাফিজা আক্ষেপ করে লিখেছেন, সাভারে একই সময়ে আরো একটি আন্তর্জাতিক প্রোগ্রামের লিড কোঅর্ডিনেটর হওয়ার সুবাধে আন্তরিক ইচ্ছা থাকা সত্বেও এই উৎসব তাকে মিস করতে হচ্ছে। সেজন্য তিনি আন্তরিকভাবে দুঃখিত। তবে তিনি পাবলিক এডমিনিষ্ট্রেশন পরিবারের সদস্যদের সাথে তাদের ব্যচের (১৯৭৩ সালের) অত্যন্ত রেয়ার কালেকশন কিছু ছবি আমাকে পোষ্ট করেছেন, যার একটি ছবি প্রিয় পাঠক আর পাবলিক এডমিন পরিবারের সদস্যদের সাথে শেয়ার করলাম, পাবলিক এডমিনের সঙ্গে থাকুন, ধন্যবাদ সকলকেedited-image-004 copy.jpg

  • Login to post comments
7
syed shah salim…
syed shah salim ahmed's picture
Tue, 11/06/2013 – 7:07am

বিভাগীয় শিক্ষক ও আয়োজক কমিটির আহবায়ক ডঃ মোবাশ্বের মোনেম ও এক্স-পাবলিক এড ও আজকের সরকারী উর্ধবতন কর্মকর্তা জনাব জালাল আহমেদ জানিয়েছেন, এরই মধ্যে অনুষ্ঠানের সকল কাজ প্রায় গুছিয়ে আনা হয়েছে। বিভাগের সকল ছাত্র-ছাত্রী এবং দেশ ও বিদেশে অবস্থানরত পাবলিক এডমিনিস্ট্রেশনের প্রাক্তন ছাত্র-ছাত্রী ও শিক্ষকবৃন্দ নানাভাবে পরামর্শ, উৎসাহ, সহযোগিতা করে চলেছেন। সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্ঠার ফলে এই অনুষ্ঠান সুচারুভাবে আয়োজন সম্ভব হচ্ছে।

জানাগেছে, ইতিমধ্যে রেজিস্ট্রেশনের কাজ প্রায় সম্পন্ন হয়েছে। তবে দেশ-বিদেশের নানা স্থান থেকে আগত এক্স-পাবলিক এডদের সুবিধার্থে অনুষ্ঠানের শেষমুহুর্ত পর্যন্ত রেজিস্ট্রেশনের একটা বিশেষ ব্যবস্থার কথা আয়োজকরা মাথায় রেখে কাজ করে চলেছেন।ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মাননীয় উপাচার্য সহ বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারের প্রায় সকলেই এই অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকবেন বলে আশা করা হচ্ছে।
publicadmin8.jpgছবিতে এক্স-পাবলিকএডদের আড্ডা দিতে দেখা যাচ্ছে। পাবলিক এড আবার প্রাণ ফিরে পাচ্ছে অনেকদিন পর।

  • Login to post comments
8
syed shah salim…
syed shah salim ahmed's picture
Sun, 09/06/2013 – 10:57pm

প্রিয় পাঠক, অনিচ্ছাকৃত ভুলের জন্য দুঃখিত। আসলে পাবলিক এডমিনিষ্ট্রেশনের ৪০ বছর পূর্তি উৎসব হবে ১৪ ও ১৫ জুন ২০১৩। আমার এই লেখাতে ভুল বশতঃ এর স্থলে হয়ে গেছে ১৫ ও ১৬ জুন, আসলে এটা পড়তে হবে ১৪ ও ১৫ জুন । অনিচ্ছাকৃত এই ভুল ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন।প্রিয় জালাল ভাই, মীর রেজাউল আলম, মোঃ নাসের খান, রকীব দেওয়ান, হক বিন ইমতিয়াজ, শরীফ ফরহাদ হোসেইন সহ সকলকে আন্তরিক ধন্যবাদ, কৃতজ্ঞতা।সুন্দর মতামতের জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ। সবাই ভালো থাকুন, সুস্থ্য থাকুন, আনন্দে থাকুন, পাবলিক এডের অনুষ্ঠানমালার সাথে একাত্মহোন, ৪০ বছরের এই অনুষ্ঠান আমাদের সকলকে নিয়ে আসুক আরো নিকটবর্তী- এই হউক প্রত্যাশা।

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *